Foto

আইএস জঙ্গিরা কি দেশে ফিরবেন?


একসময় মোহাবিষ্ট হয়ে তাঁরা দেশের মায়া ছেড়েছিলেন। চলে গিয়েছিলেন যুদ্ধক্ষেত্রে। সহিংস পন্থায় তাঁরা নতুন সমাজ ও নতুন রাষ্ট্র গড়তে চেয়েছিলেন। সেই স্বপ্ন অনেক দিন হলো ভেঙে গেছে। এবার তাঁরা নিজের দেশে ফিরতে চাইছেন। কিন্তু জন্মভূমির চোখে এখন ওই সব জঙ্গি ‘রাষ্ট্রীয় হুমকি’। এসব সন্ত্রাসীকে ফিরিয়ে নিতেও দেশগুলো অনাগ্রহী। এমন পরিস্থিতিতে জঙ্গিরা কি আদৌ নিজেদের দেশে ফিরতে পারবেন?


বেশ কিছুদিন ধরেই সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটের (আইএস) অবস্থা তথৈবচ। এই পরিস্থিতিতে শামীমা বেগম কিংবা আনোয়ার মিয়ারা ফিরে আসতে চাইছেন নিজেদের দেশে। শামীমা ও আনোয়ার যুক্তরাজ্যের নাগরিক। শামীমা তো অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থাতেই দেশ ছেড়েছিলেন। সিরিয়ায় গিয়ে আইএসে যোগ দিয়েছিলেন এবং আরেক জঙ্গিকে বিয়েও করেছিলেন। যে দেশের নাগরিকত্ব ছুড়ে ফেলে তিনি যোগ দিয়েছিলেন আইএসে, এখন আইএসের দুর্দিনে সেই নাগরিকত্বের প্রয়োগ চাইছেন শামীমা। কিন্তু মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে যুক্তরাজ্য, বাতিল করে দিয়েছে তাঁর নাগরিকত্ব।

এমন শামীমা বা আনোয়ারের সংখ্যা নেহাত কম নয়। আইএস গঠনের পর থেকে পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ থেকে ইসলামিক স্টেটে যোগ দেওয়ার ঢল নেমেছিল। লন্ডনভিত্তিক একটি সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব র‍্যাডিক্যালাইজেশন বলছে, এখন পর্যন্ত ৪১ হাজারের বেশি পশ্চিমা নাগরিক সিরিয়া ও ইরাকে গিয়ে আইএসে যোগ দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কয়েক হাজার বিদেশি নাগরিক যুদ্ধক্ষেত্রেই মারা গেছেন। গত বছরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত জন্মভূমিতে ফেরত আসতে পেরেছেন ৭ হাজার ৩৬৬ জন। বাকি আছেন আরও প্রায় সাড়ে ৮০০ পুরুষ ও কয়েক হাজার নারী। এই ’সাবেক’ হয়ে যাওয়া আইএস সদস্যরা পশ্চিমা দেশগুলোর নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছেন। এরই মধ্যে যাঁরা দেশে ফিরেছেন, তাঁদের পুনর্বাসন নিয়ে বিপাকে আছে ইউরোপীয় দেশগুলো। যুক্তরাজ্যের মতো অনেক দেশ আবার এসব জঙ্গিকে ঢুকতেই দিতে চাইছে না।

কিন্তু এসব পশ্চিমা জঙ্গি কেন দেশে ফিরতে চাইছেন? হিসাব সহজ। সিরিয়া ও ইরাকে আইএসের অবস্থা ভালো নয়। বিদেশি জঙ্গিরা এত দিন থাকতেন বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে। সেখানে মার্কিন সেনারাও পাহারা দিত। কিন্তু কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলে দিয়েছেন, সিরিয়া থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। তাই অন্যান্য পশ্চিমা দেশ যেন তাদের নাগরিকদের সরিয়ে নেয়। এতেই গোল বেধেছে। ফ্রান্স, কানাডা, নেদারল্যান্ডসের মতো পশ্চিমা দেশগুলো এত দিন তাদের ’বখে যাওয়া’ নাগরিকদের সিরিয়ার ক্যাম্পে রেখে নিশ্চিন্ত ছিল। তাঁদের ফিরিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা কারোরই ছিল না। কিন্তু ট্রাম্প বলে দিয়েছেন, যদি পশ্চিমা দেশগুলো তাদের এসব নাগরিককে ফিরিয়ে না নেয়, তবে তাঁদের জোর করেই ছেড়ে দেওয়া হবে। সংঘাতপূর্ণ সিরিয়ায় এঁদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা তখন শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে।

প্রশ্ন হলো, এঁদের নিয়ে কী করবে পশ্চিমা দেশগুলো? ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, এই জঙ্গিদের ফিরিয়ে নিয়ে পুনর্বাসনের নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে কিছু পশ্চিমা দেশ। কোনো কোনো দেশ আবার না ফেরানোর ব্যবস্থা পাকা করতে নতুন আইন করছে! যেমন অস্ট্রেলিয়া ২০১৫ সালে নাগরিকত্ব বাতিলের একটি নতুন আইন পাস করেছে। তার ফলে দুটি দেশের নাগরিকত্ব আছে এমন কোনো নাগরিকের নাগরিকত্ব বাতিল করতে পারবে অস্ট্রেলিয়া। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো, দেশ পালানো বেশ কিছু ’জঙ্গি’ নাগরিকের নাগরিকত্ব বাতিল করা। কিন্তু শুধু অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব আছে এমন কারও নাগরিকত্ব এই আইনের আওতায় বাতিল করা যাবে না। কারণ, আন্তর্জাতিক আইন কখনোই একজন ব্যক্তিকে ’রাষ্ট্রহীন’ ঘোষণা করতে উৎসাহিত করে না।

তারপরও কিন্তু শামীমা বেগম এক অর্থে রাষ্ট্রহীন হয়েই গেছেন। যুক্তরাজ্য তাঁর নাগরিকত্ব বাতিল করেছে, নিতে চাইছে না স্বামীর দেশ নেদারল্যান্ডসও। যুক্তরাজ্য জঙ্গিদের ফিরিয়ে নিয়ে পুনর্বাসন করতে খুব একটা আগ্রহী নয়। কারণ, এসব জঙ্গিকে দেশে ফেরানোর পর জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই প্রতিটি মুহূর্তে নজরদারিতে রাখা প্রয়োজন। এমন কাজের বোঝা অযথা বইতে চাইছে না ব্রিটিশ সরকার। যুক্তরাষ্ট্রও বলে দিয়েছে, আমেরিকায় জন্ম নেওয়া কোনো নারী যদি আইএসের প্রচারে কাজ করে থাকেন, তবে তিনি মার্কিন মুলুকে ফিরতে পারবেন না। অর্থাৎ এসব দেশ তাদের জঙ্গি নাগরিকদের অন্য কোনো দেশের ঘাড়ে চাপাতে চাইছে। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশের তুলনায় যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এসব বিপজ্জনক ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে রাখা কি সহজ নয়?

কিছু কিছু দেশ অবশ্য জঙ্গিদের শোধরাতে চাইছে। এই তালিকায় সৌদি আরবও আছে। আইএসের উত্থানের আগ থেকেই উগ্রপন্থায় নাগরিকদের জড়িয়ে যাওয়া নিয়ে ঝামেলায় আছে দেশটি। ২০০৪ সালে চরমপন্থী সন্ত্রাসীদের জন্য পুনর্বাসনকেন্দ্র খুলেছে সৌদি সরকার। সেখানে সুইমিংপুলসহ সব ধরনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা আছে। এমনকি পরিবারের লোকজনও দোষী ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করতে পারেন। কিন্তু এই ব্যবস্থা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। পশ্চিমা দেশগুলো এ ধরনের ব্যবস্থা অনুসরণে খুব একটা আগ্রহী নয়। তিন বছর আগে ফ্রান্স একবার উগ্রপন্থা মোকাবিলায় বিশেষ কেন্দ্র খুলেছিল। সেখানে ইতিহাস ও দর্শনের পাঠ দিয়ে উগ্রপন্থীদের শোধরানো হতো। কিন্তু শুরুর ১০ মাসের মাথায় স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রবল বিক্ষোভের মুখে সেই উদ্যোগ বন্ধ করে দিতে হয়েছিল।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এভাবে পুনর্বাসনের মাধ্যমে কোনো জঙ্গিকে আদৌ তার উগ্রবাদী চিন্তাভাবনা থেকে বের করে আনা যায় কি না, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। এই পদ্ধতি এখনো প্রমাণসাপেক্ষ। আবার এসব জঙ্গির বিচার করাও জটিল। কারণ, অভিযুক্ত ব্যক্তি কী কী অপরাধে যুক্ত ছিলেন, সেগুলোর পক্ষে প্রমাণ হাজির করা কঠিন। যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু এসব ’জঙ্গি’ নাগরিককে কারাগারে পাঠানোতেই সমাধান দেখছে। ইউরোপের দেশগুলোতে এই কাজ করা কঠিন। কারণ, সেখানে প্রত্যাবর্তনকারী ’জঙ্গি’ নাগরিকের সংখ্যা অনেক বেশি।

শোধরানোই হোক বা কারাদণ্ড দেওয়া হোক, ফিরিয়ে নেওয়ার পর কোনো না কোনো সময় এই জঙ্গিরা মুক্তি পাবেন। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যাঁরা দেশে থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন সন্ত্রাসে যোগ দিতে, তাঁরা কি পরে দেশের অভ্যন্তরে নাশকতা সৃষ্টি করবেন না?

এ ক্ষেত্রে আরেকটি বিকল্প উপায়ই আছে। মার্কিন সরকারের একটি অংশ বলছে, এসব জঙ্গিকে পাঠিয়ে দেওয়া হোক গুয়ানতানামো বেতে। এতে করে এসব জঙ্গিকে পুরোপুরি আলাদা রাখা যাবে। কিন্তু এ নিয়ে খোদ মার্কিনদের মধ্যেই দ্বিমত আছে। ডেমোক্র্যাটরা ’কুখ্যাত’ গুয়ানতানামো বে ফের চালু করতে চান না। বর্তমানে গুয়ানতানামোর কারাগারে মোটে ৪০ জন বন্দী আছে। সেই সংখ্যা বাড়াতে নারাজ ট্রাম্পের বিরোধীরা।

মোদ্দা কথা, দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া উগ্রপন্থীদের বিষয়ে স্রেফ হাত ধুয়ে ফেলতে চায় তাবৎ পশ্চিমা রাজনীতিবিদ ও সরকারপ্রধানেরা। এঁদের কোনো দায়িত্ব নিতে চান না তাঁরা। কিন্তু এতে বিদ্যমান সমস্যা মিটবে না। কারণ, মাথায় ব্যথা হলে, মাথা কেটে ফেললেই সমস্যার প্রকৃত সমাধান হয় না।

Facebook Comments

" বিশ্ব সংবাদ " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ