Foto

আইন ভেঙে স্কুলের পাশে ইটভাটা


যশোর নওয়াপাড়ার এই ভাটার ধুলা ও ধোঁয়ায় জটিল রোগের ঝুঁকিতে শিক্ষার্থীসহ আশপাশের বাসিন্দারা । আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে প্রশাসনের চোখের সামনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে ও ঘনবসতি এলাকায় ইটভাটা তৈরি করা হয়েছে।


যশোরের অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়া পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডে ’হক ব্রিক’ নামে এই ইটভাটায় এখন পুরোদমে কাজ চলছে। স্কুলের কোমলমতি শিক্ষার্থী ও আপশাশের বাসিন্দারা ভাটার ধুলা ও ধোঁয়ায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। সর্দি, কাশি ও ফুসফুসজনতি রোগের প্রবণতা খুবই বেড়ে গেছে। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন আইন-২০১৩ অনুযায়ী এমন স্পর্শকাতর এলাকায় ইটভাটা করার জন্য পরিবেশ ছাড়পত্র পাওয়ার সুযোগ নেই। তারপরও ভাটা করা হয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপ দণ্ডনীয় অপরাধ। এরই মধ্যে ভুক্তভোগী এলাকাবাসী ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জেলা প্রশাসন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরে অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পায়নি। প্রশাসন যেন নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে।

সরেজমিন নওয়াপাড়া পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বুইকরা গ্রামে বুইকরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে জানা যায়, নওয়াপাড়া বাজারের ব্যবসায়ী নাসিমুল হক গত নভেম্বর মাস থেকে স্কুলের পাশে ভাটায় ইট তৈরির কাজ শুরু করেন। সেই সঙ্গে শুরু হয়েছে পরিবেশ বিপর্যয়। এখন সেখানে পুরোদমে ইট তৈরি হচ্ছে। ফসলি জমিতে চলছে ইট তৈরির কাজ। এসব জমি চাষাবাদের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। স্কুল ভবনে ধুলার আস্তরণ পড়েছে। শ্রেণিকক্ষে ধুলাবালি জমে আছে। এই বিপর্যস্ত পরিবেশের মধ্যেই পড়াশোনা চলছে কোমলমতি শিশুদের।

ইটভাটা অপসারণের দাবিতে জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া আবেদনপত্রে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও এলাকাবাসী অভিযোগ করেছে, দূর থেকে ট্রাক, নসিমন, ভটভটিতে করে মাটি আনা হচ্ছে। ধুলাবালিতে পরিবেশ দূষিত হয়ে শিক্ষার্থীদের কাশি, অ্যালার্জিজনিত রোগ ও শ্বাসকষ্ট প্রকট আকার ধারণ করছে। চলাচলের রাস্তাটিও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবাসিক এলাকার মধ্যে ইটভাটা করায় আশপাশের বাড়িতে বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কয়লা দিয়ে ইট পোড়ানোয় এলাকার গাছপালা, ঘরবাড়ি, পশুপাখি মারত্মক হুমকির মুখে রয়েছে। এ ছাড়া মেশিন দিয়ে ইট কাটার বিকট শব্দে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে মনোনিবেশ করতে পারছে না। অথচ আইন অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশ বা আবাসিক এলাকায় ইটভাটা স্থাপনের কোনো সুযোগ নেই।

ইটভাটা প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩-এর ৮(১) ধারার ক, খ, গ ও ঘ উপধারায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, পৌরসভা ও আবাসিক এলাকা এবং সরকারি স্থাপনার এক কিলোমিটারের মধ্যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক কিলোমিটারের মধ্যে এবং ঘনবসতি এলাকার মধ্যে ভাটা করা যাবে না। ব্যবহার করা যাবে না কৃষিজমি। কিন্তু হক ব্রিকের মালিক নওয়াপাড়ার প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নাসিমুল হক সব আইন উপেক্ষা করে ভাটার ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। এলাকাবাসী ও বুইকরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অভয়নগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, যশোর পরিবেশ অধিদপ্তর ও নওয়াপাড়া পৌরসভার মেয়র বরাবর লিখিত অভিযোগ করেও কোনো সুফল পায়নি তারা।

বুইকরা গ্রামের বাসিন্দা মো. রোকনুজ্জামান জানান, তারা অভয়নগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, যশোর পরিবেশ অধিদপ্তর ও নওয়াপাড়া পৌরসভার মেয়রের কাছে প্রতিকার চেয়েও কোনো ফল পাননি। বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে তাদের ঘরবাড়ি। রাস্তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতে পারছে না। এ সমস্যার কথা আর কোথায় জানাব- তা ভেবে পাচ্ছি না। বুইকরা গ্রামের বাসিন্দা আবদুর রশিদ বলেন, বাড়ির পাশে ইটভাটা। রাত-দিন কাজ হচ্ছে। প্রচণ্ড শব্দে রাতেও ঘুমাতে পারছি না।

বুইকরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল গফফার বলেন, ধুলাবালিতে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনেক সমস্যা হচ্ছে। তা ছাড়া রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে গেছে। চলাচলে মারাত্মক সমস্যা হচ্ছে।

এলাকাবাসী অতিষ্ঠ হয়ে গত ১ জানুয়ারি ভাটার কারণে পরিবেশ বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরে যশোর পরিবেশ অধিদপ্তরে অভিযোগ করে। ওই অফিসের বাশার নামে এক ব্যক্তি ২ জানুয়ারি অভিযোগপত্রটি গ্রহণ করেন।

এ ব্যাপারে যশোর পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শেখ মো. নাজমুল হুদা বলেন, ’আমরা অভিযোগ পেয়েছি। সেই মোতাবেক ভাটা বন্ধ করার জন্য সপ্তাহখানেক আগে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।’ কত দিনের মধ্যে ভাটা বন্ধ করতে বলা হয়েছে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ’১৫ কার্যদিবসের মধ্যে ভাটা বন্ধ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বন্ধ না হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ নোটিশ অনুযায়ী ১৫ কার্যদিবস এখনও শেষ হয়নি। তবে সরেজমিন দেখা যায়, এখনও পুরোদমে ভাটার কাজ চলছে। বন্ধ করার কোনো প্রক্রিয়া শুরু হয়নি।

আইন উপেক্ষা করে ভাটা নির্মাণের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে অভয়নগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহিনুজ্জামান বলেন, ’ভাটার মালিককে কাজ না করার জন্য বলেছি।’ এখনও কাজ চলছে জানালে তিনি বলেন, ’আমি দেখব।’

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মোবাইল ফোনে ইটভাটার মালিক নাসিমুল হকের সঙ্গে কথা হয়। আইন অমান্য করে ইটভাটা করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সরাসরি কোনো উত্তর দেননি। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, ভাটা করার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়েছেন কি-না। এ সময় তিনি তার মোবাইল ফোন অন্য এক ব্যক্তির কাছে দিয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে বলেন। তবে ওই ব্যক্তি তার পরিচয় দেননি। তিনি জানান, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি। তবে এখন নেওয়ার চেষ্টা করবেন।

Facebook Comments

" আইন ও বিচার " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ