Foto

আন্তর্জাতিক মান থেকে পিছু হটল কেন্দ্রীয় ব্যাংক


দেশের ব্যাংক খাত আন্তর্জাতিকসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে ২০১২ সালে কিছু নীতি গ্রহণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু ঋণখেলাপিদের চাপে সেই নীতি থেকে পিছু হটল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আন্তর্জাতিক মান মেনে কোনো গ্রাহক ৩ মাস ঋণ পরিশোধ না করলেও তাকে শ্রেণিকৃত করার নীতি বদলানো হয়েছে। এখন ৩ মাসের পরিবর্তে ৬ মাস পর্যন্ত ঋণ পরিশোধ না করেই নিয়মিত গ্রাহক থাকা যাবে। আগামী ৩০ জুন থেকে সংশোধিত নীতিমালা কার্যকর হবে। এতে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা নতুন করে ঋণ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। আন্তর্জাতিক বাজারে বেকায়দায় থাকা দেশের ব্যাংক খাতের সংকট আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


সূত্র জানায়, ঋণখেলাপিদের ২০১৪ সাল থেকে টানা ছাড় দিয়ে আসছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু এতেও এখনো লাগামহীন খেলাপি ঋণ। নিয়ম শিথিল করে বিশেষ ছাড়ে পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন ও সুদ মওকুফ সুবিধা দেওয়ার পরও গত বছরই খেলাপি ঋণ বেড়েছে সাড়ে ২৬ শতাংশ বা ১৯ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৩ হাজার ৯১০ কোটি

টাকা। আগের বছরে যা ছিল ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা। আওয়ামী লীগ সরকার টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতাগ্রহণ করেই খেলাপি ঋণ কমানোর ঘোষণা দেয়। আ হ ম মুস্তফা কামাল অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এ ঘোষণা দিচ্ছেন। কিন্তু খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য আদায়ের পরিবর্তে নীতি পরিবর্তন করে ছাড়ের পথে হাঁটছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশেই বাংলাদেশ ব্যাংক ছাড়ের নির্দেশনা জারি করছেন বলে জানা গেছে। এর আগে অবলোপন নীতিমালা সহজ করা হয়েছে। এ ছাড়া ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট ও ৯ শতাংশ সুদ নির্ধারণ করে পুনঃতফসিল নীতিমালাও খুব শিগগিরই শিথিল করা হবে বলে জানা গেছে।
ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশন নীতিমালা শিথিল করে গতকাল সোমবার সার্কুলার জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর কাছে পাঠানো ওই সার্কুলারে বলা হয়, অর্থনৈতিক চক্র গতিশীল এবং ব্যবসায় বর্তমান পরিস্থিতিকে সুবিধা দিতে নতুন নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। এর আগে ২০১২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নীতিমালা জারি করা হয়। ওই নীতিমালা জারির আগে যে বিধান ছিল, তাও আবার নতুন করে জারি করা হলো।
বর্তমানে কোনো ঋণের কিস্তি তিন মাস অনাদায়ী হলে সাব-স্ট্যান্ডার্ড, ছয় মাস অনাদায়ী হলে সন্দেহজনক এবং ৯ মাস মেয়াদোত্তীর্ণ হলে মন্দ মানে খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকরণ করা হয়। নতুন নীতিমালায় খেলাপি ঋণ হিসাবায়নের তিনটি ক্ষেত্রেই সময় বাড়ানো হয়েছে। আগামী ৩০ জুন থেকে সব ধরনের চলতি ঋণ, ডিমান্ড ঋণ, ফিক্সড টার্ম লোন অথবা যে কোনো ঋণের কিস্তি তিন মাসের বেশি, কিন্তু ৯ মাসের কম অনাদায়ী থাকলে তা সাব-স্ট্যান্ডার্ড ঋণ হিসেবে হিসাবায়ন করা হবে। অর্থাৎ আগে ত্রৈমাসিক এক কিস্তি না দিলেই খেলাপি হতে হতো, এখন দুই কিস্তি পরিশোধ না করলে খেলাপি হতে হবে।
৯ মাসের বেশি কিন্তু ১২ মাসের কম অনাদায়ী থাকলে, তা ডাউটফুল লোন বা সন্দেহজনক ঋণ হবে। আগে ৬ মাসের বেশি ৯ মাসের কম অনাদায়ী ঋণকে ডাউটফুল লোন বা সন্দেহজনক ঋণ বলা হতো। আর ১২ মাসের বেশি অনাদায়ী ঋণ ব্যাড অ্যান্ড লস বা মন্দ ঋণ হবে। আগে ৯ মাসের বেশি অনাদায়ী ঋণ মন্দ ঋণ হিসেবে বিবেচিত হতো।
এই ছাড়ের ফলে ঋণখেলাপিরা যেমন সুযোগ পাবেন, তেমনি ব্যাংক মালিকরাও সুবিধা পাবেন। খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন রাখার বিধান রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকের অশ্রেণিকৃত বা নিয়মিত ঋণের বিপরীতে দশমিক ২৫ থেকে ৫ শতাংশ হারে প্রভিশন রাখতে হয়। নিম্নমান বা সাব স্ট্যান্ডার্ড ঋণের বিপরীতে রাখতে হয় ২০ শতাংশ, সন্দেহজনক ঋণের বিপরীতে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ বা কুঋণের বিপরীতে ১০০ শতাংশ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। প্রভিশন ঘাটতি থাকলে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারে না সংশ্লিষ্ট ব্যাংক।
খেলাপি ঋণ নীতিমালা শিথিল করার ফলে ইচ্ছা করে একজন গ্রাহক ৬ মাসের মধ্যে কয়েকটি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে লাপাত্তা হতে পারেন। কেননা ৬ মাস পর্যন্ত কিস্তি না দিয়ে তিনি খেলাপিমুক্ত থাকবেন। এতে ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি তৈরি হবে। আবার অতিরিক্ত খেলাপি ঋণ, নিয়মনীতির অভাব, জালিয়াতির কারণে দেশের অনেক ব্যাংক বিদেশের ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সরাসরি ব্যবসা করতে পারে না। সরাসরি ঋণগ্রহণ, আমদানি-রপ্তানি করতে পারে না। এ নীতিমালা শিথিল করার পর আরেকটি অজুহাত দেখানোর সুযোগ পাবেন বিদেশিরা। এতে অন্য কোনো বিদেশি ব্যাংকের গ্যারান্টি নিয়ে ব্যবসা করতে হবে। ফলে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের খরচ বেড়ে যাবে।

 

Facebook Comments

" জাতীয় খবর " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ