Foto

আর্থিক প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ও অকার্যকর ঋণ ২ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা


বিশেষ ছাড়ে খেলাপি ঋণ নবায়নের সুযোগ আটকে গেল আরও দু’মাস * ঋণখেলাপিদের সুবিধা দিয়ে ভালো গ্রাহকদের নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে : হাইকোর্ট


ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বর্তমানে খেলাপি ও অকার্যকর ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরাসরি খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ৮০ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে বিভিন্ন আদালত স্থগিতাদেশ দিয়েছেন যে, এসব ঋণ খেলাপি করা যাবে না। এ কারণে ওইসব ঋণ এখন নিয়মিত হিসেবে আছে।

কিন্তু আদালতের স্থগিতাদেশের আগে ওইসব ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এসব ঋণগ্রহীতা ঋণখেলাপি হলেও আদালতের কারণে এদেরকে খেলাপি হিসেবে শনাক্ত করা যাচ্ছে না। এ ছাড়া বাকি ৩০ হাজার কোটি টাকার ঋণ অবলোপন বা রাইট অফ (ব্যাংকের মূল হিসাব থেকে আলাদা করে রাখা) করা হয়েছে। এসব ঋণও খেলাপি। এগুলো আদায় করতে ব্যর্থ হয়ে ব্যাংকগুলো এসব ঋণ আলাদা হিসাবে রেখে খেলাপির পরিমাণ কমিয়েছে।

এদিকে ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুযোগ দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা সার্কুলারের ওপর স্থিতাবস্থার মেয়াদ আরও দু’মাস বাড়িয়েছেন হাইকোর্ট। এ আদেশের ফলে আগামী ২৪ আগস্ট পর্যন্ত ওই সার্কুলারের কোনো কার্যকারিতা থাকবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ৯ শতাংশ সুদে ১০ বছরে খেলাপি ঋণ পরিশোধের সুযোগ দিয়ে গত ১৬ মে এ সংক্রান্ত সার্কুলার জারি করেছিল। আদালতের নির্দেশে তা স্থগিত হয়ে যায়। সোমবার বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

আদালতের নির্দেশে সোমবার খেলাপি ঋণের তথ্য হাইকোর্টে উপস্থাপন করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। তবে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম, তাদের খেলাপি ঋণের বা অর্থের পরিমাণ কত, তা আদালতে প্রকাশ্যে জানানো হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক সিলগালা করে এসব তথ্য অ্যাটর্নি জেনারেলকে দিয়েছেন। তিনি ওই অবস্থায়ই তা আদালতে উপস্থাপন করেছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে- ১ কোটি টাকার উপরে ১০ হাজার ৪৭৬ জন খেলাপির তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ১ হাজার ১০৬ জন এবং ব্যাংকগুলোর ৯ হাজার ৩৭০ জন খেলাপির তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে আর্থিক খাতের দুর্নীতি বন্ধের বিষয়ে হাইকোর্ট এর আগে যে রুল জারি করেছিলেন, আগামী দু’সপ্তাহের মধ্যে হলফনামা আকারে তার জবাব দিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্য বিবাদীদের এর জবাব দিতে হবে।

উল্লেখ্য, মানবাধিকার সংগঠন এইচআরপিবির করা রিট আবেদনে হাইকোর্ট গত ১৩ ফেব্রুয়ারি এক আদেশে ঋণখেলাপির তালিকা দাখিলের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে রুল জারি করেন। সোমবার রুলের শুনানিতে আদালত বলেন, ঋণখেলাপিদের সুবিধা দিয়ে ভালো গ্রাহকদের নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে ব্যাংকের পরিচালকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) ওয়াদা করেছিল, সুদের হার এক অঙ্গে নামাবে। কিন্তু তারা সে অঙ্গীকার রাখেনি।

আদালত আরও বলেন, ব্যাংক বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভালো গ্রাহকদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে না। আর ঋণখেলাপিরা দেশের বাইরে বাড়ি (সেকেন্ড হোম) বানিয়ে আরামে জীবনযাপন করছেন।

গত ২০ বছরে কোটি টাকার উপরে ঋণখেলাপিদের তালিকা, কী পরিমাণ ঋণের সুদ মওকুফ করা হয়েছে, ঋণের সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে যে অনিয়ম হয়েছে, তা বন্ধে কী কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, সেসব তথ্য দাখিল করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংককে। সে অনুযায়ী অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনজীবী হিসেবে আদালতে সিলগালা অবস্থায় ওই প্রতিবেদন জমা দেন। আদালতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মুনীরুজ্জামান। রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। এ সময় রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এবিএম আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার উপস্থিত ছিলেন।

শুনানিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম খেলাপি ঋণের তথ্য হাইকোর্টে উপস্থাপন করেন। এ সময় আইনজীবী মনজিল মোরসেদ আপত্তি জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ ব্যাংকেরই এটি আদালতে উপস্থাপন করা উচিত ছিল। কিন্তু প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেছেন যিনি, তিনি বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল। ১৬ কোটি মানুষের বিরুদ্ধে তিনি যেতে পারেন না।

এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেল বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনজীবী হিসেবে আদালতে সিলগালা অবস্থায় দুটি প্যাকেট (প্রতিবেদন) জমা দেন। এ সময় আদালত আরও বলেন, সাধারণ মানুষ গৃহায়ন ঋণ পাচ্ছে না। সুদের হার বাড়ানো হচ্ছে। একজন চাকরিজীবী অবসরে গিয়ে কিছু করতে পারছেন না অতিরিক্ত করের কারণে। সেভিং অ্যাকাউন্ট করলেও সারচার্জ দিতে হয়।

শুনানি শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনজীবী মো. মুনিরুজ্জামান বলেন, আগের আদেশ অনুসারে আজ ঋণখেলাপিদের তালিকা হাইকোর্টে দাখিল করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী ওই তালিকা গোপনীয় হওয়ায় তা সিল করা প্যাকেটে আদালতে দাখিল করা হয়। কারণ, আইন অনুযায়ী ওই তালিকা বাংলাদেশ ব্যাংক বা আমরা কেউই প্রকাশ করতে পারি না।

মানবাধিকার সংগঠন এইচআরপিবির করা রিট আবেদনে হাইকোর্ট গত ১৩ ফেব্রুয়ারি এক আদেশে ঋণখেলাপির তালিকা দাখিলের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে রুল জারি করেন। রুলে আর্থিক খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা বন্ধে কমিশন গঠনের কেন নির্দেশ দেয়া হবে না, এবং এই কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়।

এ আদেশের পরও ঋণখেলাপির তালিকা দাখিল না করায় গত ৩০ এপ্রিল হাইকোর্ট অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং ১৫ দিনের মধ্যে তালিকা দাখিল করার নির্দেশ দেন। এ অবস্থায় ১৬ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনজীবী মনিরুজ্জামান আদালতকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী আইনগতভাবে তাদের এ তালিকা দাখিল করার এখতিয়ার নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান রিট আবেদনকারী পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। এরপর আদালত ২৪ জুনের মধ্যে দাখিল করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দেন।

Facebook Comments

" বিশ্ব অর্থনীতি " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ