Foto

ইলিশের শানশওকত বাড়ছে


পয়লা বৈশাখ এলেই শহরবাসীর অনেকের মধ্যে লোকদেখানো পান্তা-ইলিশ খাওয়ার ধুম পড়ে। ইলিশের দামও আকাশ ছুঁয়ে যায়। তবে এই চিত্র সারা বছরের নয়। বছরজুড়ে এখন ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে, দামও কমে তা মধ্যবিত্তের নাগালে। ইলিশের ওজন ও আকারও বাড়বাড়ন্ত। সব মিলিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে রাজকীয় এই মাছের শানশওকত বাড়ছে।


ইলিশের আকার-আকৃতি, ওজন, প্রজনন ও দাম নিয়ে নিয়মিত জরিপ করে মৎস্য অধিদপ্তর ও আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড ফিশের ইকো ফিশ প্রকল্প। তাদের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে দেশের ইলিশের গড় আকৃতি ও ওজন বেড়েছে। ২০১৪ সালে ধরা পড়া ইলিশের গড় ওজন ছিল ৫১০ গ্রাম। ২০১৮ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৮৮০ গ্রাম। একই সময়ে ধরা পড়া মাঝারি আকৃতির (আধা কেজি থেকে ১ কেজি) ইলিশ ৪০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৭ শতাংশ হয়েছে। আর জাটকা ধরার পরিমাণ ৬০ শতাংশ থেকে কমে ১৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এতে ইলিশের গড় দামও গত এক বছরে ২০ শতাংশ কমেছে।

এ বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খান প্রথম আলোকে বলেন, পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে ঢাকাসহ বড় শহরে ইলিশের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এতে অনেক এলাকায় জেলেরা বেশি লাভের আশায় জাটকা ধরেন। ভোক্তারা বেশি দাম দিয়ে ওই মাছগুলো কেনেন। কিন্তু ভোক্তারা এটা না করলে জাটকাগুলো বড় হতে পারে। এতে ইলিশ বেশ কম দামে কেনার সুযোগ তৈরি হয়। তিনি বৈশাখ এলেই বেশি দাম দিয়ে ইলিশ কেনার এই মানসিকতা থেকে সরে আসার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

মূলত ইলিশ রক্ষায় সরকারের নানা পদক্ষেপ, ইলিশের ডিম পাড়া ও বড় হওয়ার জন্য নতুন অভয়াশ্রম ঠিক করার কারণে মাছটির উৎপাদন বাড়ছে। ইলিশ ধরা যাদের মূল পেশা অর্থাৎ দেশের প্রায় ৫ লাখ জেলের সারা বছরের মোট আয়ও বেড়েছে। ইকো ফিশ প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে জেলেদের মাথাপিছু বার্ষিক গড় আয় ৮৪ হাজার ৬৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ২৮ হাজার ৮১৮ টাকা হয়েছে।

অবশ্য জেলেদের এই আয় বাড়ার কারণ শুধু ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য নয়। ওয়ার্ল্ড ফিশের জরিপ বলছে, নদীগুলোতে পাঙাশ, আইড়, বাঘা আইর ও রিঠা মাছের উৎপাদন ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেড়েছে। এর কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই চার ধরনের মাছের অন্যতম প্রধান খাবার জাটকা ইলিশ। জাটকা না ধরার মৌসুমে এই মাছগুলো জাটকা খেয়ে বড় হচ্ছে। ফলে জেলেরা জাটকা না ধরে ওই চার ধরনের মাছ বেশি পাচ্ছেন। একই সঙ্গে ওই মাছগুলোর উৎপাদন ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেড়েছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও ওয়ার্ল্ড ফিশের হিসাবে, ২০০৬-০৭ অর্থবছরে দেশে মোট ইলিশের উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৭৯ হাজার টন। ওই বছর বিশ্বের ইলিশের অর্ধেক ছিল বাংলাদেশের। ৩০ শতাংশ উৎপাদন ছিল ভারতে ও বাকিগুলো মিয়ানমার ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন বেড়ে ৫ লাখ ১৭ হাজার টন হয়েছে। গত বছর বিশ্বের মোট উৎপাদিত ইলিশের ৮৬ শতাংশ ছিল বাংলাদেশের। ভারত, মিয়ানমারসহ অন্য দেশগুলোতে ইলিশের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে।

ওয়ার্ল্ড ফিশের ইকো-ফিশ প্রকল্পের প্রধান ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল ওয়াহাব প্রথম আলোকে বলেন, ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন বাড়ায় ধনীদের পাত থেকে ইলিশ মধ্যবিত্তের ঘরেও প্রবেশ করেছে। একই সঙ্গে ইলিশের অভয়াশ্রম এলাকাগুলোতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের সংখ্যা বাড়ছে ও জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ হচ্ছে।

ইলিশ বড় হলে পুষ্টিগুণও বাড়ে। মৎস্যবিজ্ঞানীরা বলছেন, ইলিশের শরীরে থাকা চর্বি বা তেল উচ্চ রক্তচাপ ও বাতের ব্যথা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, চোখ উজ্জ্বল করে, অবসাদ দূর করে, মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়ায়। আর ইলিশ যত বড় হবে, তার শরীরে ফ্যাটি অ্যাসিড, ওমেগা-৩ ও চর্বির পরিমাণও আনুপাতিক হারে বাড়বে।

 

Facebook Comments

" জাতীয় খবর " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ