Foto

কমছে না সুদহার খেলাপিরাই দায়ী


খেলাপি ঋণের বিপরীতে আয় দেখাতে পারে না ব্যাংক। অথচ ব্যাংকগুলোকে সব গ্রাহকের টাকা সুদসহ নিয়মিত পরিশোধ করতে হয়। এর বাইরে খেলাপি ঋণের মামলা পরিচালনায় বাড়তি খরচ করতে হয়। মুনাফা থেকে রাখতে হয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি। এভাবে খেলাপি ঋণ পদে পদে ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। ফলে ব্যাংকের সুদহার কমানোর বড় প্রতিবন্ধক বা বাধা হয়ে দাঁড়ায় এই খেলাপি ঋণ।


ঋণখেলাপিদের কারণে ঊর্ধ্বমুখী ধারায় চলে যাওয়া সুদহারের দায় নিতে হচ্ছে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করা ভালো ঋণগ্রহীতাদের। ব্যাংকগুলো সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ বিতরণের ঘোষণা দিলেও বাস্তবে তা কার্যকর করতে পারছে না। এর মূল কারণ হলো উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং অতিরিক্ত মুনাফা করার প্রবণতা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অবলোপনসহ গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৩৩ হাজার ২৩২ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ স্থিতি রয়েছে ৯ লাখ ১১ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। ফলে অবলোপন বিবেচনায় নিলে মোট ঋণের ১৪ দশমিক ৬২ শতাংশ খেলাপি। আর ৩৯ হাজার ৩২১ কোটি টাকার অবলোপন বাদ দিলে খেলাপি দাঁড়ায় ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ। এ পরিমাণ অর্থের বিপরীতে ব্যাংকগুলো এক টাকাও আয় পাচ্ছে না। অথচ পুরো আমানতের বিপরীতে সুদ ব্যয় করতে হচ্ছে। এর বাইরে এসব ঋণের বিপরীতে মামলা পরিচালনার জন্য বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে। আবার এডিআর, সিআরআর ও এসএলআর হিসাবায়নের সময় এসব অর্থ বিবেচনায় নিতে গিয়ে ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।

ব্যাংকগুলো গত ডিসেম্বরে গড়ে ৫ দশমিক ২৬ শতাংশ সুদে আমানত নিয়েছে। ঋণ বিতরণ করেছে ৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ সুদে। উদাহরণ হিসেবে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত অবলোপনসহ ব্যাংক খাতের ৫ শতাংশ ঋণ খেলাপি ধরা হলো। এতে মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়াবে ৪৫ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা। নিয়মিত ঋণের সঙ্গে বাকি ৮৭ হাজার ৬৬১ কোটি টাকার বিপরীতে আয় আসবে। এতে বর্তমানের গড় সুদহার অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর বাড়তি আয় আসবে ৮ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা। আবার এই ৮৭ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে মামলা খরচ করতে হবে না। নিরাপত্তা সঞ্চিতিও রাখতে হবে না। তখন বর্তমানের তুলনায় আমানতকারীকে বেশি সুদ এবং ঋণে কম সুদ নিলেও নিট আয় বাড়বে। আবার এখনকার চেয়ে গড় সুদহার ১ শতাংশ কমালেও নিট আয় বর্তমানের চেয়ে বেশি হবে।

সরকার ঋণের সুদহার কমানোর জন্য উদ্যোগ নিয়েছে। গত ২৪ মার্চ অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এক অনুষ্ঠানে জানান, "অনিচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ১২ বছরের জন্য পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হবে। বর্তমানে এই খেলাপিদের সুদহার যাই থাকুক, পুনঃতফসিলের ঋণে সুদহার হবে মাত্র ৭ শতাংশ।" অবশ্য গত ২ এপ্রিল মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে এটা সংশোধন করে বলেন, সুদহার ৭ নয়, ৯ শতাংশ হবে। অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, "বেশ আগে থেকেই এক অঙ্ক বা সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ বিতরণের কথা বলা হচ্ছে। তবে নানা কারণে সেটা কার্যকর হয়নি। এখন সিঙ্গেল ডিজিট করে দেওয়া হচ্ছে। নতুন ঋণগ্রহীতাদের বিষয়ে তিনি বলেন, "এখন থেকে নতুন ঋণের জন্য যারা আসবেন তাদের সুদের হার দুই অঙ্ক বা ডবল ডিজিট হবে না।"

জানতে চাইলে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন সমকালকে বলেন, ব্যবসা নেই অথচ ঋণের নামে কোটি কোটি টাকা নিয়ে অনেকে ফেরত দিচ্ছে না। তাদের কারণে সুদহারও কমছে না। এসব ইচ্ছাকৃত খেলাপির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারা বজায় রাখতে সুদহার এক অংকে নামিয়ে আনতে হবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা অবশ্যই করতে হবে।

বেসরকারি পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএ হালিম চৌধুরী সমকালকে বলেন, বাংলাদেশে ভালো গ্রাহকরা কোনো পুরস্কার পান না। অথচ ঋণখেলাপিদের বারবার পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন, সুদ মওকুফসহ নানা সুবিধা দেওয়া হয়। আবার প্রত্যক্ষভাবে ঋণখেলাপিদের দায় ভালো গ্রাহকদের নিতে হয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ধরুন এক হাজার কোটি টাকা ঋণের মধ্যে কোনো ব্যাংকের তিনশ" কোটি টাকা খেলাপি। এই খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের কোনো আয় আসে না। অথচ এক হাজার কোটি টাকার পুরোটার বিপরীতেই আমানতকারীকে সুদ দিতে হয়। ফলে ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় হিসাবের ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণকে বিবেচনায় নিতে হয়। আবার প্রতিটি ব্যাংকের লক্ষ্য থাকে মুনাফা করা। স্বাভাবিকভাবে তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সঙ্গে নির্দিষ্ট মাত্রায় স্প্রেড রাখতে হয়। এর বাইরে মুনাফা থেকে প্রভিশন, একটি অংশ রিজার্ভে সংরক্ষণ করতে গিয়ে সুদহার বেড়ে যায়। ফলে খেলাপি ঋণ যত কম থাকবে তত কম সুদে ঋণ বিতরণ করা যাবে, এটাই স্বাভাবিক।

ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের মধ্যে রাষ্ট্রীয় ৬ বাণিজ্যিক ব্যাংকে রয়েছে ৪৮ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা। বিশেষায়িত দুই ব্যাংকে রয়েছে ৪ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৫৭ শতাংশ রয়েছে সরকারি ব্যাংকগুলোতে। রাষ্ট্রীয় মালিকানার একটি ব্যাংকের ঋণ আদায় বিভাগের এক মহাব্যবস্থাপক সমকালকে বলেন, সরকারি ব্যাংকগুলো তুলনামূলক কম সুদে ও বিনা সুদে আমানত পায়। এর পরও এসব ব্যাংকে বেসরকারি ব্যাংকের তুলনায় মুনাফা কম হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সরকারি ব্যাংকগুলো নিট লোকসানে থাকে। এর অন্যতম কারণ ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ। তিনি বলেন, কিছু ব্যাংকে বেশি খেলাপি ঋণ থাকলে সামগ্রিকভাবে সুদহার বেড়ে যায়। কেননা, বাজার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে খেলাপি ঋণ কম থাকা ব্যাংকের কাছাকাছি সুদে বেশি খেলাপি ঋণের ব্যাংকও ঋণ বিতরণ এবং আমানত সংগ্রহ করে থাকে। এতে বেশি খেলাপি ঋণ থাকা ব্যাংকটি বছর শেষে লোকসানে পড়ে; এটা ঠিক, তবে একেবারে বন্ধ হয়ে যায় না। ফলে খেলাপি ঋণ না কমলে ভালো গ্রাহকদেরও উচ্চ সুদে ঋণ নিতে হবে। আমানতকারীও ঠকতে থাকবে।

সংশ্নিষ্টরা জানান, ব্যাংকের হাতে থাকা সব টাকার বিপরীতে আমানতকারীকে সুদ দিলেও সব টাকা ঋণ দিতে পারে না। আমানতকারীর সুরক্ষায় প্রতিটি ব্যাংককে ঋণ আমানত অনুপাত (এডিআর) সীমা মেনে চলতে হয়। বর্তমান নিয়মে প্রচলিত ধারার একটি ব্যাংক একশ" টাকা আমানতের বিপরীতে সাড়ে ৮৩ টাকা ঋণ দিতে পারে। ইসলামী ব্যাংকগুলো পারে ৮৯ টাকা। অবশ্য এই ৮৩ ও ৮৯ টাকা হিসাবের ক্ষেত্রে সরকারি বিল বন্ডে বিনিয়োগকে বিবেচনায় নেওয়া হয় না। এই বিল বন্ডের বিপরীতে ব্যাংকগুলো বিধিবদ্ধ জমা (এসএলআর) হিসেবে সাড়ে ১৩ শতাংশ সংরক্ষণ করতে পারে। এ হিসাবে একেবারে নগদে রাখতে হয় সাড়ে ৫ টাকা। নগদ জমা সংরক্ষণ বা সিআরআর হিসেবে বিবেচিত এ অর্থের বিপরীতে এক টাকাও সুদ পায় না ব্যাংক। যদিও এ অর্থের বিপরীতেও আমানতকারীকে সুদ দিতে হয়।

ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান এবং এনসিসি ও মেঘনা ব্যাংকের সাবেক এমডি মোহাম্মদ নূরুল আমিন সমকালকে বলেন, কোনো ঋণ খেলাপি হলে প্রথম ক্ষতি ওই পরিমাণ টাকা আর বাজারে নতুন ঋণ দেওয়ার সুযোগ থাকে না। অথচ ব্যাংকের ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) হিসাবের ক্ষেত্রে তা বিবেচনায় নেওয়া হয়। এতে ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়। এ ছাড়া একটি ব্যাংকের একশ" কোটি টাকার ঋণ খেলাপি না হয়ে সময়মতো ফেরত এলে নতুন করে আরেকজনকে দেওয়া যেত। তাতে অর্থনীতির গতি সঞ্চার হতো। দ্বিতীয়ত, প্রভিশন রাখার ফলে মুনাফা কমে যায়। তৃতীয়ত, খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য আইনি, যাতায়াত, সময়সহ একটা বাড়তি ঝামেলা ও খরচ করতে হয়। সব মিলিয়ে ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেড়ে সুদহার বাড়ছে। উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে ভালো গ্রাহকরা আলাদা করে আর সুবিধা পাচ্ছেন না।

Facebook Comments

" ব্যবসা ও বাণিজ্য " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ