Foto

কর নিয়ে নীতিনির্ধারকরা ‘গরিবের কথা ভাবেন না


ওয়ার্কার্স পার্টির সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশা বলেছেন, সংসদে যারা কর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন তারা গরিবের কথা না ভেবে ধনী, কর্পোরেট কিংবা বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দেন। মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে অ্যাকশনএইড আয়োজিত ‘জনগণের কর আদলত’ নামে দিনব্যাপী এক অনুষ্ঠানে একথা বলেন তিনি।


Hostens.com - A home for your website

জনবান্ধব একটি কর ব্যবস্থা প্রচলনে সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহিত করতে এই আয়োজন করা হয়, যেখানে দেশের সাতটি বিভাগ থেকে আসা সাধারণ মানুষ কর নিয়ে নিজের ক্ষোভের কথা তুলে ধরেন।

কর আদালতে পাঁচটি বিষয়ে অভিযোগ উপস্থাপন করা হয়। প্রথম শুনানিতে পোশাক শ্রমিক ফাতেমা আক্তার বলেন, “আমার মালিক পণ্য রপ্তানিতে ৪ শতাংশ ভর্তুকি পান। আবার ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণও পান। অথচ সামান্য পরিমাণে বেতন বাড়াতে আমাদের রাস্তায় নামতে হয়।

“অন্যদিকে সীমিত আয়ে সংসার চালাতে নিত্য, প্রয়োজনীয় দ্রব্য কিনতে মালিকের সমপরিমাণ মূল্য সংযোজন কর দিতে হয় আমাদের। এটা কেমন কর ব্যবস্থা?”

বস্তিবাসী এই নারী বলেন, “বস্তিতে বৈধ বিদ্যুতের ব্যবস্থা, গ্যাস সংযোগ, এমনকি বর্জ্য পরিষ্কারের ব্যবস্থাও নেই। পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের জন্যও সরকার কোনো সেবা দেয় না। অথচ বাসা ভাড়া, বিদ্যুৎ ও পানির বিল থেকে শুরু করে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য যেমন ওষুধ, সাবানসহ শিশুর লেখাপড়ার জিনিসপত্র কিনতে গেলে ভ্যাট দিচ্ছি আমরা। এমনকি মোবাইল ফোনে কথা বলতেও আমরা ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিয়ে যাচ্ছি।

“অথচ প্রয়োজনীয় নাগরিক সেবা পাই না। এজন্য বর্তমান কর কাঠামো এবং সরকারের পরিচালন ব্যবস্থাই দায়ী।”

কলেজ শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন বলেন, “শিক্ষা ব্যয় মেটাতে আমার বাবুর্চি বাবার মাসে খরচ হয় ৬৫০০ টাকা। এর মধ্যে ৪০০ টাকাই ভ্যাট। তিন বছরে বাসের ভাড়া বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ। সব মিলিয়ে সেবা পেতে এবং ভ্যাটের কারণে বছরে সাড়ে নয় হাজার টাকা অতিরিক্ত গুনতে হয় আমার পরিবারকে। অথচ আমার পরিবারের আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। ফলে শিক্ষা ব্যয় মেটাতে আমার পরিবারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।”
নগরবাসী ফজলুর রহমান বলেন, “সরকার পণ্য উৎপাদনকারীদের উপর ভ্যাট বা ট্যাক্স বাড়ালে তারা তাদের পণ্যের দাম বাড়িয়ে তা সমন্বয় করেন। ফলে করের টাকাটা শেষমেষ সাধারণ মানুষের পকেট থেকেই যায়। আবার সেই পণ্য কিনতে গিয়ে আরও ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হয় সেই সাধারণ মানুষদেরই।
“সুপারশপে কিনলে আরও ৪ শতাংশ যোগ হয়। এতো কর দেয়ার পরও সরকারের সঠিক সেবা আমরা পাই না। প্রতিবছর বাজেট আসে মরার উপর খাড়ার ঘা হয়ে। বর্তমানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডেও আয়ের ৩৫ শতাংশই আসে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে। অথচ এটি হওয়ার কথা উল্টো।”

অভিযোগের বিষয়ে এমিকাস কিউরি হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, “কর অন্যায্যতা ও অযৌক্তিতার কারণে ভুক্তিভোগী হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। অতিরিক্ত কর দিয়েও রাষ্ট্রের কাছ থেকে যে সেবা পাচ্ছেন তা অপ্রতুল।”

এ বিষয়ে ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, “সংবিধানের সঙ্গে বাজেটের কোনো মিল নেই। কারণ সংসদে যারা কর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তারা গরিবের কথা ভাবেন না। বরঞ্চ, তাদের সিদ্ধান্তে ধনী, কর্পোরেট কিংবা বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বার্থই বেশি গুরুত্ব পায়। তাই সংসদে এবং বাজেটে জনবান্ধব কর নিয়ে খুব কম কথাই হয়। যার খেসারত দিতে হয় সাধারণ মানুষকে।”

তিনি বলেন, “বিদেশে অর্থপাচার, ধনীদের ট্যাক্স ফাঁকি কিংবা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কর ফাঁকির কারণে সরকার সাধারণ মানুষের উপর অতিরিক্ত কর আরোপ করে। এ কারণেও বাংলাদেশে বৈষম্য বাড়ছে।"

অনুষ্ঠানের ধারণাপত্রে বলা হয়, “বহুজাতিক কর্পোরেট কোম্পানির বিপুল পরিমাণ টাকার কর ফাঁকি ও অর্থপাচার যদি রোধ করা সম্ভব হয় তাহলে বিদেশে অর্থপাচার বন্ধ হবে। আর টাকা দিয়ে সাধারণ জনগণের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ উপযুক্ত মানের নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি দেশে প্রচলিত কর প্রথার যে অসম বণ্টন ব্যবস্থা রয়েছে তার প্রতিকার সম্ভব হবে। সাধারণ জনগণের মাথা থেকে ভ্যাটের বোঝাও কমবে।”

জনগণের এই কর আদালতের বিচারক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, “সরকার প্রণীত নীতি ও আইনগুলো এমন যাতে রাজস্ব আয়ের বোঝাটা গিয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের উপর। পরোক্ষ করের পরিমাণ যেখানে কম হওয়ার কথা সেখানে সাধারণ মানুষকেই সেই কর বেশি দিতে হয়। অথচ বৈধ-অবৈধ উপায়ে হাজার হাজার কোটি টাকা দেশের বাইরে পাচার করছেন ক্ষমতাসীনরা।

“আবার কর ফাঁকিও দিচ্ছেন তারা। সেদিকে সরকারের খেয়াল নেই। ফলে এখনও এদেশে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ খাতে সরকারের বিনিয়োগ কম। সাধারণ মানুষ কর দিয়েও সেখানে সেবা পান না। এটি খুবই দুঃখজনক।”

অনুষ্ঠানের সঞ্চালক, বিচারক ও অ্যাকশনএইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, “আমরা কর দিতে চাই। তবে সেই কর হওয়া উচিত সাধারণ জনবান্ধব। সাধারণ জনগোষ্ঠীর উপর থেকে ভ্যাটের বোঝা কমাতে বাংলাদেশ সরকারের কর্পোরেট কর আহরণের পরিমাণ বাড়াতে হবে। কারণ জাতীয় রাজস্বে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর কর সামান্য পরিমাণেই যোগ হয়। ফলে সরকারকে ভিন্ন উপায়ে যেমন ভ্যাটের উপর জোর দিতে হয় রাজস্ব আদায়ের জন্য।

“এই সুযোগে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো কর ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছে। আর করের ঘাটতির কারণে উন্নয়ন বাজেটের বরাদ্দ কমে যাচ্ছে, বিশেষ করে গণসেবা খাতসমূহে যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা খাতে। তাদের বাজেট ঘাটতি এবং গরিব মানুষের উপর থেকে ভ্যাটের বোঝা কমাতে কর্পোরেট কর আদায়ের পরিমাণ বাড়াতে হবে।”

 

Facebook Comments

" বিশ্ব অর্থনীতি " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ

Web Hosting and Linux/Windows VPS in USA, UK and Germany

Visitor Today : 446

Unique Visitor : 73705
Total PageView : 93179