Foto

ছায়ানটের বর্ষবরণে শুভবোধ জাগরণের আহ্বান


নতুন দিনের সূর্য উঠেছে। বাংলা দিনপঞ্জিকায় আজ রোববার থেকে শুরু হয়েছে ১৪২৬ সালের দিনগণনা। ঐতিহ্য অনুযায়ী আজ ভোরে রমনার বটমূলে নতুন বছরকে বরণ করে নিয়েছে ছায়ানট।


ছায়ানটের বর্ষবরণে এবারের স্লোগান "অনাচারের বিরুদ্ধে জাগ্রত হোক শুভবোধ"। তাদের বর্ষবরণের আয়োজনের শুরুতে ছিল প্রকৃতির স্নিগ্ধতা ও সৃষ্টির মাহাত্ম্য নিয়ে ভোরের সুরে বাঁধা গানের পরিবেশনা। পরের ভাগে ছিল অনাচারকে প্রতিহত করা এবং অশুভকে জয় করার জাগরণী সুরবাণী, গান-পাঠ-আবৃত্তিতে দেশ-মানুষ-মনুষ্যত্বকে ভালোবাসার প্রত্যয়।

বরাবরের মতো এবারও সকাল সোয়া ছয়টার দিকে ছায়ানটের বর্ষবরণের অনুষ্ঠান শুরু হয়। আয়োজন শেষ হয় সকাল সাড়ে আটটার দিকে। জাতীয় সংগীত গেয়ে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সমাপ্তি টানার আগে শুভবোধ জাগরণের আহ্বান জানান ছায়ানট সভাপতি সন্‌জীদা খাতুন। তিনি বলেন, "বৎসরকাল পেরিয়ে আমরা আবার নতুন দিনের মুখোমুখি। কেমন সময় পেরিয়ে এলাম? চোখ মেললে কিংবা কান পাতলে নিত্যই শিশু, নারী, বল-ভরসাহীন মানুষ তথা সমগ্র মানবতার ওপরে নির্মম আচরণের সংবাদ, নিয়ত মার খাচ্ছে সমাজের ধারণা। কোথায় যাচ্ছি? নিষ্কলুষ শিশুসন্তান কোনো সমাজবাসীর অত্যাচারের শিকার হয় কী করে? সমাজ কি পিতামাতা, ভাইবোন, সন্তানসন্ততির গৃহ আর প্রতিবেশী নিয়ে গঠিত শান্তিনিবাস নয়? স্বার্থান্বেষী অমানুষদের আত্মসুখ সন্ধানের ফলে নির্যাতনের হাত থেকে পরিত্রাণ পায় না পরিবার, সমাজের কচিকাঁচা থেকে শুরু করে কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতী, সমাজের কোনো মানুষ।" তিনি প্রশ্ন করেন, নববর্ষ যদি ভ্রাতৃত্ববোধ-মানবতাবোধের উন্মেষ না ঘটাতে পারে, তবে নতুন দিন কি বার্তা নিয়ে আসে?

ছায়ানট সভাপতি আরও বলেন, "ওরা অপরাধ করে—কেবল এই কথা না বলে প্রত্যেকে নিজেকে বিশুদ্ধ করার চেষ্টা করি। আর আমরা যেন নীতিবিহীন অন্যায়-অত্যাচারের নীরব দর্শকমাত্র হয়ে না থাকি। প্রতিবাদে, প্রতিকার সন্ধানে হতে পারি অবিচল। নববর্ষ এমন বার্তাই সঞ্চার করুক আমাদের অন্তরে।"

এর আগে অসিত কুমার দের রাগ ললিত আলাপ ও বন্দিশ পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল আয়োজন। পরে ছায়ানটের নবীন-প্রবীণ শিল্পীরা সমবেত কণ্ঠে শোনান রবীন্দ্রনাথের "মোরে ডাকি লয়ে যাও" গানটি। খায়রুল আনাম শাকিল শোনান অজয় ভট্টাচার্যের লেখা "প্রথম আলোয় লহ প্রণিপাত" গানটি।

একে একে ছায়ানটের শিক্ষার্থী-প্রাক্তনী-শিক্ষক নিয়ে শ খানেক শিল্পী অংশ নেন। ছিল ১৩টি একক ও ১৩টি সম্মেলক গান এবং ২টি আবৃত্তি। রবীন্দ্র রচনা থেকে বেছে নেওয়া হয়েছে আবৃত্তি দুটি। ত্রপা মজুমদার করেন "প্রশ্ন" এবং জহিরুল হক খান করেন "এবার ফিরাও মোরে"। একই ধারায় গানগুলো নির্বাচন করা হয়েছে কাজী নজরুল ইসলাম, অতুলপ্রসাদ সেন, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন, লালন শাহ, মুকুন্দ দাস, অজয় ভট্টাচার্য, শাহ আবদুল করিম, কুটি মনসুর, সলিল চৌধুরী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনা থেকে। এর মধ্যে ছিল "আপনারে দিয়ে রচিলি রে কি এ", "হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী", "এখনো গেল না আঁধার", "সর্ব খর্বতারে দহে তব ক্রোধদাহ", "হেরি অহরহ তোমারি বিরহ", "একদিন যারা মেরেছিল", "ভাইয়ের দোরে ভাই কেঁদে যায়", "ঐ মহাসিন্ধুর ওপার হতে", "স্বদেশ আমার! জানি না তোমার", "আমায় রাখতে যদি আপন ঘরে", "বঙ্গ আমার, জননী আমার", "কোন মেস্তরি নাও বানাইল", "ও মোদের দেশবাসীরে আয়রে" ইত্যাদি গানের একক ও দলীয় পরিবেশনা।

ছায়ানটের আয়োজনে শামিল হতে ভোরেই রমনার বটমূলে নানা শ্রেণি, পেশা ও বয়সের মানুষের সমাগম ঘটে। তাদের পরনে ছিল রঙিন পোশাক। মনে উচ্ছ্বাস। তারা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পুরো অনুষ্ঠান উপভোগ করে। রমনার এই অনুষ্ঠানকে ঘিরে সংশ্লিষ্ট এলাকায় নেওয়া হয় কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা। নিরাপত্তা বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্যকে সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা যায়। রমনায় প্রবেশের ক্ষেত্রে করা হয় তল্লাশি। বাঙালির প্রাণের এই উৎসবকে ঘিরে আজ দিনভর থাকছে নানা আয়োজন। প্রাণের টানে ইতিমধ্যে হাজারো মানুষ ঘর থেকে বেরিয়েছেন। তারা সবাই নানা সাজে সজ্জিত। উল্লাসে-উচ্ছ্বাসে তারা মাতোয়ারা।

 

Facebook Comments

" জাতীয় খবর " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ