Foto

তারা পদোন্নতি চান না


চাকরি জীবনে পদোন্নতি একজন কর্মকর্তার কাছে বহুল কাঙ্ক্ষিত। পদোন্নতির জন্য বৈধ-অবৈধ নানা পন্থায় চেষ্টা-তদবির করেন অনেকে। তবে অনেক খাদ্য পরিদর্শকের ক্ষেত্রে বিষয়টি একদম বিপরীত। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, পদোন্নতি ঠেকাতে তারা তাদের এসিআর (বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন) জমা না দেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তদবির করেন। অনেকে কৌশলে নিজের এসিআরে ঝামেলা তৈরি করিয়ে রাখেন। অনেকে এসিআরের ফাইলই গায়েব করে ফেলেন।


Hostens.com - A home for your website

এই খাদ্য পরিদর্শকরা দুর্নীতিবাজ হিসেবে পরিচিত। খাদ্য পরিদর্শকদের নিয়ন্ত্রণে থাকে খাদ্য অধিদপ্তরের খাদ্যগুদামগুলো। অনেকের কাছে গুদামগুলো যেন ’রসের ভাণ্ডার’। এই রস ছেড়ে যেতে চান না পরিদর্শকরা। তাদের অনেকে গুদামকে ঘিরেই চাকরি জীবন পার করতে চান। এর আগে অনেকে এভাবে চাকরি জীবন পারও করেছেন। পদোন্নতি হলে গুদাম ছেড়ে যেতে হবে- এটি তারা ভাবতেই পারেন না।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে খাদ্য পরিদর্শকদের পদোন্নতির ঘটনায় বিষয়টি আবার সামনে চলে এসেছে। ওই সময় ২৫৮ জন খাদ্য পরিদর্শকের পদোন্নতির তালিকা তৈরি করেছিল খাদ্য অধিদপ্তর। পরে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পদোন্নতির সুপারিশ করে এসিআরসহ ২৩০ জনের ও এসিআর ছাড়া ২৮ জনের তালিকা পাঠানো হয় সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি)। এসিআরসহ অন্যান্য নথি থাকায় পিএসসি যথারীতি ২৩০ জনের পদোন্নতি দিয়েছে। ওই ২৮ জনের তালিকার সঙ্গে এসিআর ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় তাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। জানা গেছে, ওই ২৮ জন পিএসসির এমন সিদ্ধান্তই চেয়েছিলেন। এতে তারা খুশি। পিএসসিতে এসিআর জমা না হলে পদোন্নতিও হবে না। এটিই তাদের টার্গেট। এর আগেও এসিআর জটিলতায় পদোন্নতি না হওয়ার ভূরি ভূরি ঘটনা রয়েছে।

খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) একেএম ফজলুর রহমান সমকালকে বলেন, কেউ ইচ্ছা করলে পদোন্নতি নাও নিতে পারেন। এটি তার ব্যক্তিগত বিষয়। পদোন্নতির জন্য কেউ এসিআর জমা না দিলে তাগিদ দিয়ে জমা নেওয়া হয় না। কেউ ইচ্ছা করলে পুরো চাকরি জীবন খাদ্য পরিদর্শক হিসেবে কাটাতে পারেন। তিনি বলেন, অনেকে তার কর্মস্থল থেকে বদলি হতে চান না। এ কারণে পদোন্নতির জন্য তার এসিআর জমা দেওয়া হয় না। অন্যরা কেন এসিআর জমা দেন না, তা তার জানা নেই।

গুদামকে ঘিরে খাদ্য পরিদর্শকদের অনিয়ম, দুর্নীতির ঘটনা নতুন নয়। গুদাম থেকে শত শত টন ধান, চাল খোলাবাজারে বিক্রি করাসহ নানা দুর্নীতির ঘটনায় বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতিবাজ খাদ্য পরিদর্শকরা গ্রেফতার হয়েছেন, কারও কারও বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। কেউ কেউ জেলও খাটছেন। তবু তারা গুদাম ছাড়তে চান না।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, খাদ্য অধিদপ্তরই খাদ্য পরিদর্শকদের বছরের পর বছর বা গোটা চাকরি জীবন গুদামে থাকার সুযোগ করে দিয়েছে। বাধ্যতামূলকভাবে পর্যায়ক্রমে পদোন্নতি নেওয়ার বিধান থাকা দরকার ছিল। পদোন্নতি বাধ্যতামূলক করা হলে গুদামের মধু খাওয়ার সুযোগ থাকত না।

জানা গেছে, নিয়ম অনুযায়ী খাদ্য পরিদর্শকরা পদোন্নতি পেয়ে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হন। তখন তাদের গুদামে গড়াগড়ি করার সুযোগ থাকে না। খাদ্য পরিদর্শকরা গুদামের রাজা হয়ে ধান, চাল সংগ্রহ, বিতরণসহ গুদাম-সংশ্নিষ্ট কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকতে চান। তাতে তাদের বাড়তি আয়ের পথ খোলা থাকে। এই কারণেই পদোন্নতির প্রতি তাদের আগ্রহ নেই।

জানা গেছে, সারাদেশে খাদ্য পরিদর্শকের সংখ্যা ১ হাজার ৬৬৭ জন। তাদের এসিআর জমা থাকে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের (ডিসি-ফুড) দপ্তরে। নিয়ম অনুযায়ী পদোন্নতির সুপারিশ করে ডিসি ফুডের দপ্তর থেকে এসিআরগুলো আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের (আরসি-ফুড) দপ্তরে পাঠানো হয়। আরসি ফুডের দপ্তর থেকে সেগুলো পাঠানো হয় খাদ্য অধিদপ্তরে। খাদ্য অধিদপ্তর থেকে পাঠানো হয় খাদ্য মন্ত্রণালয়ে। পরে মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো হয় পিএসসিতে। এরপর পিএসসি সংশ্নিষ্টদের এসিআরসহ অন্যান্য নথি যাচাই করে পদোন্নতির সিদ্ধান্ত নেয়।

খাদ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, এসিআর না পাওয়ায় পদোন্নতির বিবেচনা থেকে ওই ২৮ জনের নাম বাদ রেখেছে পিএসসি। তাদের এসিআর পাঠানোর জন্য তাগিদও দিয়েছে পিএসসি। এসিআর জমা না দেওয়ায় যে ২৮ জনের পদোন্নতি হয়নি তারা হলেন- খালেদুল ইসলাম খান, আবেদ আলী, আবদুল হামিদ, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, ফরহাদ হোসেন, শাহ আল মামুন খান, শহিদুল ইসলাম, কাজী মিনারুল ইসলাম, তরুণ প্রকাশ চাকমা, এসএম শামীম হাসান, মজনুর রহমান, ফুলজামাত আলী, হারুন অর রশীদ, হাবিবুর রহমান, ফরিদ উদ্দিন, আবদুল লতিফ চৌধুরী, দেলোয়ার হোসেন (বাবুল), সরওয়ার মোর্শেদ, মো. আলাউদ্দিন, ইন্দু বিকাশ কারবারী, রেজাউল হক, হাসিনা মমতাজ, উত্তম কুমার দাস, মাজেদুল ইসলাম, মামুনুর রশীদ, রওশানুল কাওসার, জাহাঙ্গীর হোসেন ও মোহাম্মদ আতাউর রহমান।

এসিআর জমা না দেওয়ায় উত্তম কুমার দাস ও জাহাঙ্গীর হোসেনকে এরই মধ্যে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে অধিদপ্তরের সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এসিআর কেন জমা হয়নি তার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে তাদের কাছে। উত্তম কুমার দাস সমকালকে বলেন, তার এসিআরে ঝামেলা থাকার কারণে তার পদোন্নতি হয়নি। তবে তার এসিআর জমা পড়েছিল। পরবর্তী পর্যায়ে তার পদোন্নতি হবে বলে জানান।

খাদ্য পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ সমকালকে বলেন, পদোন্নতির বিষয়টি সব খাদ্য পরিদর্শকের সর্বাগ্রে স্থান দেওয়া উচিত। পদোন্নতিতে একদিকে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া যায়, অন্যদিকে সামাজিক মর্যাদা বাড়ে। তিনি আরও বলেন, ওই ২৮ জনের পদোন্নতি না হওয়ায় তাদের পরের সিরিয়ালের পরিদর্শকের পদোন্নতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বাঁকা পথে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যেই পদোন্নতিতে তাদের আগ্রহ নেই।

খাদ্যগুদামের সাম্প্রতিক কেলেঙ্কারি :বিগত দিনে গুদামে অনিয়ম, দুর্নীতির ঘটনায় জড়িত ছিলেন খাদ্য পরিদর্শকরা। গুদামের যে কোনো দুর্নীতি, ধান, চাল লোপাটের ঘটনায় তাদের হাত রয়েছে।

২০১৭ সালের ৭ সেপ্টেম্বর গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র‌্যাব সদর দপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলমের নেতৃত্বে একটি দল রাজধানীর তেজগাঁওয়ের খাদ্যগুদামে অভিযান চালিয়ে ট্রাকভর্তি বস্তার চাল মেপে পরিমাণ কম পান। ৩০ কেজির বস্তায় ছিল ১২, ১৪ ও ১৬ কেজি। ঢাকা-৪ আসনের এমপি সৈয়দ আবুল হোসেন বাবলার নির্বাচনী এলাকার পানিবন্দি মানুষের মাঝে বিতরণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া ৩০ টন চাল গুদাম থেকে সরবরাহ করা হচ্ছিল। পুরো চাল মেপে সাড়ে ২০ টন পাওয়া গিয়েছিল। বাকি সাড়ে ৯ টন আত্মসাৎ করা হয়। একই সময়ে গুদামের নথিপত্র যাচাই করে ঢাকা জেলা আনসারকে ২৫৮ টন চাল সরবরাহের তথ্য পাওয়া যায়। ম্যাজিস্ট্রেট ওই সময় আনসার কমান্ডার আমিন উদ্দিনকে ফোনে কত চাল পেয়েছেন জানতে চাইলে তিনি ৭৫ টন চাল পেয়েছিলেন বলে জানান।

২০১৭ সালের ২০ জুলাই চট্টগ্রামের হালিশহর ও দেওয়ানহাটের গুদাম থেকে ২ হাজার টনেরও বেশি চাল-গম উধাও হয়েছিল। সরকারি ডিও (ডিমান্ড অর্ডার) ছাড়া ভুয়া কাগজপত্রে ছাড় করিয়ে ওই পরিমাণ চাল খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়। ওই সময় স্থানীয় কয়েকজন চাল ব্যবসায়ীর আড়তে সেই চাল পাওয়া যায়।

২০১৩ সালের ২১ অক্টোবর খাদ্য বিভাগের এক তদন্তে দেশের পাঁচ জেলার গুদামে বস্তাভর্তি তুষ, মাটি, বালু ও কয়লা পাওয়া যায়। এ সময় আত্মসাৎ করা হয়েছিল ৭৬০ টন চাল। ওই সময় এই পরিমাণ চালের বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৪ কোটি টাকা। ওই সময় তদন্তকালে বেশ কয়েকটি জেলার গুদামে কাগজপত্রের হিসাবে ও প্রকৃত মজুদে গরমিল পাওয়া যায়।

সরকারি চাল আত্মসাতের অভিযোগে করা মামলায় ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার সাবেক খাদ্য নিয়ন্ত্রক আবদুল জলিল ও গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাজী হাসিবুল হাসানকে গ্রেফতার করে দুদক। ২০১২ সালে গুদামের ৬০ টন চাল আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

গত বছরের জুলাইয়ের আগে তিন বছরে কয়েকটি ধাপে কুমিল্লার দৌলতগঞ্জ খাদ্যগুদাম থেকে ১ হাজার ৮০০ টন চাল আত্মসাৎ করা হয়। ওই সময়ে ওই পরিমাণ চালের বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৭ কোটি টাকা।

Facebook Comments

" জাতীয় খবর " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ

Web Hosting and Linux/Windows VPS in USA, UK and Germany

Visitor Today : 578

Unique Visitor : 76346
Total PageView : 94397