Foto

দলে ভাঙন ঠেকাতে সংসদে বিএনপি?


শেষ পর্যন্ত নিজেদের সিদ্ধান্তে অনড় থাকতে পারল না বিএনপি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির বিজয়ী ছয় সদস্যকে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বিএনপির শীর্ষ নেতা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর চার মাস ধরে সংসদে না যাওয়ার ব্যাপারে দলটির শক্ত অবস্থান নমনীয় হওয়ার পেছনে তিনটি কারণের কথা উল্লেখ করেছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় এক নেতা এবং বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত নন কিন্তু বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল একজন বুদ্ধিজীবী।


আরও কয়েকজনের মতো এ দুজনও তারেক রহমানের সঙ্গে গত দুদিনে বিএনপির সংসদে যাওয়া উচিত-অনুচিত বিষয় নিয়ে টেলিফোনে কথা বলেছেন।

এই দুজনের মতে, তারেক রহমানের বা বিএনপির দলীয় এমন সিদ্ধান্তের পেছনে কাজ করা তিনটি কারণ হলো: এক. বিএনপির সম্ভাব্য ভাঙন ও বিভেদ ঠেকানো, দুই. দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রতি সরকারের নমনীয় আচরণ ও বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি দলটির নেতাদের আস্থাহীনতার প্রকাশ দৃশ্যমান না করা।

বিএনপির একজন দায়িত্বশীল নেতা গতকাল সোমবার রাতে আলাপকালে প্রথম আলোকে বলেন, সিদ্ধান্তটা তারেক রহমান নির্বাচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এবং দল ও দলের বাইরের কয়েকজন শুভাকাঙ্ক্ষীর সঙ্গে কথা বলে নিয়েছেন। তবে এটাও ঠিক, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সব সদস্য এটা জানতেন না। ওই নেতা বলেন, এটা ঠিক যে এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই বিএনপির অসহায়ত্ব, দুর্বলতা, কিছু করতে না পারা, নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্বসহ নানা দিক থেকে বিবেচনা করবেন। কিন্তু বিএনপি দেখেছে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিএনপি যে সমস্যায় পড়বে, এই সিদ্ধান্ত নেওয়া না হলে সংকট আরও ভয়াবহ হবে।

আলাপকালে ওই নেতা বলেন, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়া অন্যদের শপথ নেওয়া ঠেকানো যাচ্ছিল না। বিশেষ করে দলের যুগ্ম মহাসচিব হারুনুর রশীদকে শপথ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় দলটিকে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ভূমিকা রেখেছে। বিএনপির পাঁচজন সাংসদ সংসদে অবস্থান করলে এবং বিএনপি তাদের ধারণ না করলে সংসদের এই নেতারা বাইরের নেতাদের চেয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের কাছে বেশি অগ্রাধিকার পেতেন। এতে দলে বিভিন্ন সময় অন্য পর্যায়ের বা অন্য কোনো কারণে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নেতারা নিজেদের নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কাজ করে যেতেন, যা দলে বিভক্তি সৃষ্টি করত। দলকে ভাঙনের দিকে নিতে পারত। সক্রিয় নেতা-কর্মীদের নিষ্ক্রিয় ও বিভ্রান্তিতে ফেলে দিত।

বিএনপি বলছে, ঠাকুরগাঁও থেকে নির্বাচিত জাহিদুর রহমান ২৫ এপ্রিল শপথ নেওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে স্থানীয় পর্যায়ে বড় কোনো প্রতিরোধ দেখা যায়নি। কেন্দ্রীয় বা স্থানীয় কর্মীদের ক্ষোভ সেভাবে দৃশ্যমান হয়নি। ফলে, অন্যরা শপথ নিলে বিএনপির মধ্যে এঁদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে বলে মনে হয়নি দলটি শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের।

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া প্রায় ১৫ মাস ধরে কারাগারে। বিএনপির সূত্র বলছে, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা এখন মোটেও ভালো না। এ অবস্থায় সংসদে যাওয়া নিয়ে বিএনপি যদি আগের অবস্থানেই থাকে, তাহলে সরকার বিএনপির চেয়ারপারসনের জামিন, প্যারোল বা মুক্তির বিষয়ে কঠোর অবস্থানেই থাকবে। অন্যদিকে, আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মুক্তির কোনো সম্ভাবনা আপাতত দেখছে না বিএনপি। ফলে, বিএনপি অনড় অবস্থানে থেকে খালেদা জিয়ার ব্যাপারে কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না।


বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুজন নেতা বলেন, খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে তারেক রহমান বিএনপির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে এখন পর্যন্ত খালেদা জিয়ার সিদ্ধান্তগুলোই কেবল দলীয় নেতারা মেনে নিয়েছেন। তারেক রহমানের নির্দেশ সব পর্যায়ের নেতারা যে খুব একটা গ্রহণ করছেন, তা নয়। তারেক রহমান নেতাদের শপথ নিতে বারবারই নিষেধ করেছেন। কথা বলেছেন। কিন্তু কাজ হয়নি। ফলে, দলকে একতাবদ্ধ রাখতে খালেদা জিয়ার প্রয়োজনীয়তা বেশি। অন্যদিকে, তারেকের কথা না শুনে যদি নেতারা শপথ নিতেন, তাহলে নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ ছিল। শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এ দুটি বিষয়ও বিবেচনায় এসেছে।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। হঠাৎ সিদ্ধান্ত বদল প্রসঙ্গে ফখরুল বলেন, ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে সংসদে কথা বলার সীমিত সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সংসদ ও রাজপথের আন্দোলনকে যুগপৎভাবে চালিয়ে যাওয়াকে বিএনপি যুক্তিযুক্ত মনে করছে।

বিএনপির রাজনীতির প্রতি সহানুভূতিশীল—এমন একজন বুদ্ধিজীবী প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপির যাঁরা সংসদে যাবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছিলেন, তাঁরা বলছেন, সংসদে তাঁরা দলীয় চেয়ারপারসনের মুক্তি, পুনর্নির্বাচন, নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা, মামলা ও নির্যাতন বন্ধের কথা বলবেন। এই কথাগুলো বলেই বিএনপি রাজপথের আন্দোলন জোরদার করার চেষ্টা করছে। বিএনপি যদি দলীয় পাঁচ সাংসদকে বহিষ্কার করে, তাহলে দুই পক্ষের একই ধরনের বক্তব্যে মানুষ বিভ্রান্ত হতো। তা ছাড়া রাজপথের বক্তব্যের চেয়ে সংসদে দেওয়া বক্তব্য বেশি মানুষকে আকৃষ্ট করে। এতে সংসদের বাইরের বিএনপির ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় প্রথম আলোকে বলেন, সংসদে যাওয়া নিয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত বদলের বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না। এ ধরনের সিদ্ধান্ত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মহাসচিবের মাধ্যমেই তুলে ধরেন।

একাদশ সংসদে বিএনপির ছয়জন নির্বাচিত হন। এঁরা হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, হারুনুর রশীদ, আমিনুল ইসলাম, জাহিদুর রহমান, উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়া ও মোশারফ হোসেন। এর মধ্যে জাহিদুর ২৫ এপ্রিল শপথ নেওয়ার কারণে দল থেকে বহিষ্কৃত। আর মির্জা ফখরুল এখনো শপথ নেননি। অন্যরা গতকাল শপথ নিয়েছেন।

 

Facebook Comments

" রাজনীতি " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ