Foto

ব্যাংকসহ পাঁচ রুট আসছে মনিটরিংয়ের আওতায়


বিদেশে টাকা পাচার প্রতিরোধে ব্যাংকিং খাতসহ পাঁচটি রুট মনিটরিংয়ের আওতায় আনা হচ্ছে। এগুলো হচ্ছে- মোবাইল কোম্পানির মুনাফা বিদেশে প্রেরণ, বিদেশি জাহাজ ভাড়া, দেশে কর্মরত বিদেশি কর্মীর অর্থ প্রেরণ, আন্ডার ও অভার ইনভয়েসিং এবং জমি রেজিস্ট্রেশন।


মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে গঠিত ’জাতীয় সমন্বয় কমিটির’ সর্বশেষ সভায় নেয়া হয় এ সিদ্ধান্ত।

ওই সভায় অর্থ পাচার সংক্রান্ত অপরাধের তদন্ত দ্রুত শেষে মামলা দায়েরের সিদ্ধান্ত হয়। এছাড়া ব্যাংকিং চ্যানেলে ভুয়া এলসি খুলে পণ্য আমদানি না করেই টাকা পাচারের ঘটনা বন্ধেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সম্প্রতি জানান, দুই পন্থায় অর্থ পাচার হয়। এক ব্যাংক ব্যবস্থা অন্যটি আমদানি-রফতানির আড়ালে। এর বাইরে বড় আকারে অর্থ পাচার হয় না।

এখন এগুলো বন্ধ করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। বন্দরগুলোয় স্ক্যানার মেশিন বসানো হচ্ছে। পাশাপাশি ওভার প্রাইসিং আর আন্ডার প্রাইসিং রোধে পিএসআই’র আদলে এনবিআরে একটি সেল খোলা হবে। এতে দেশ থেকে টাকা পাচার কমে আসবে।

সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে মানি লন্ডারিং সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির ২৩তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া, জাতীয় সমন্বয় কমিটির সদস্য সচিব ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আসাদুল ইসলাম, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ শহিদুল হক, অর্থ বিভাগের সচিব আবদুর রউফ তালুকদার।

সূত্র মতে, ওই বৈঠকে দেশ থেকে অর্থ পাচারের বিভিন্ন চ্যানেল এবং প্রতিরোধে করণীয় বিষয় গুরুত্ব পায়। বৈঠকে বলা হয়, টাকা পাচারের অন্যতম একটি চ্যানেল হচ্ছে ব্যাংকিং খাত। এলসি খোলার মাধ্যমে তা করা হয়।

আবার অর্থ পাচার প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে ব্যাংকগুলো। বিশেষ করে গ্রাহক নির্বাচন ও গ্রাহকের ব্যবসার ধরন নির্বাচনে ব্যাংকগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের দায়-দায়িত্ব অনেক বেশি। বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, গ্রাহক নির্বাচন ও গ্রাহকের ব্যবসার ধরন সম্পর্কে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সতর্ক না হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সূত্র জানায়, ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থপাচার সব চেয়ে বেশি হয় ভুয়া এলসি খোলার মধ্য দিয়ে। অনেক সময় ভুয়া এলসি খুলে পণ্য আমদানি না করেই পুরো টাকা বিদেশে পাচার করে দেয়া হয়। এক্ষেত্রে পণ্য জাহাজিকরণের ভুয়া কাগজপত্রও তৈরি করা হয়। একটি সিন্ডিকেট ব্যাংকের এলসির মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে এ কাজটি করে আসছে। এসব বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।

এদিকে ওভার ইনভয়েসিং ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পায় জাতীয় সমন্বয় কমিটির সভায়। কারণ এই কৌশলে দীর্ঘদিন ধরে অর্থ পাচার হচ্ছে।

পণ্যভিত্তিক বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ পাচার বন্ধ করতে আগামী জুলাই থেকে সব সমুদ্র ও স্থলবন্দরে স্ক্যানার স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বৈঠকে। এটি স্থাপনের পর আমদানি-রফতানিকৃত পণ্য যাচাই-বাছাই করা হবে। যাতে কেউ মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য বাণিজ্যের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচার করতে না পারে। পাশাপাশি পণ্যের মূল্য যাচাই-বাছাইয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তত্ত্বাবধানে পৃথক একটি আধুনিক ইউনিট চালুর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এ প্রসঙ্গে বলেন, পণ্যের মিথ্যা মূল্য ঘোষণা বন্ধ করতে এ সেল কাজ করবে। বিশেষ করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন এলাকায় ঢুকে পণ্যের দাম জানা হবে। এরপর সেল থেকে পণ্যের মূল্য সম্পর্কে রিপোর্ট দেয়া হবে। ওই দামের চেয়ে ব্যবসায়ীদের পণ্যের ঘোষিত মূল্য উনিশ-বিশ হলে সমস্যা হবে না। তবে বেশি পার্থক্য থাকলে পণ্যগুলো বাজেয়াপ্ত করা হবে। এখানেই শেষ নয়, ঘোষিত পণ্য সঠিক না হয়ে পাথর, বালি, ইট-বালু হতে পারে। সেক্ষেত্রে যারা এর সঙ্গে জড়িত তাদের জরিমানার পাশাপাশি আইন অনুযায়ী মামলা করা হবে।

সূত্র আরও জানায়, ওই বৈঠকে উপস্থিত দুদকের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ এনবিআরের কাছে ওভার ইনভয়েসিংয়ের ম্যাধমে অর্থ পাচার সংক্রান্ত মামলাগুলো দুদকে সরবরাহের অনুরোধ জানান।

বৈঠকে বিদেশি কর্মীদের দেশ থেকে টাকা পাঠানোর বিষয়টি উঠে আসে। সেখানে বলা হয়, বিভিন্ন সময়ে ট্রাভেল ভিসা নিয়ে অনেক বিদেশি কর্মী দেশে প্রবেশ করছে। পরবর্তীকালে ভিসার ধরন (ই-ভিসা) পরিবর্তন করে উচ্চ বেতনে চাকরি করছেন।

তাদের কাছ থেকে যথাসময়ে আয়কর আদায় করা যাচ্ছে না। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। বৈঠকে এ বিষয়ে নজরদারির আওতায় আনার সিদ্ধান্ত হয়।

প্রসঙ্গত ব্যবসায়ীদের মতে, দেশে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত বিদেশি কর্র্র্মীরা বছরে কয়েকশ’ কোটি ডলার বিদেশে পাঠাচ্ছে। শুধু ভারতে বছরে পাঠানো হচ্ছে ৫শ’ কোটি টাকা। বৈঠকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশের এজেন্সিকে দায়িত্ব দেয়া হয়।

এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব মোস্তাফা কামাল বলেন, আমদানি ও রফতানির ক্ষেত্রে জাহাজ ভাড়া পরিশোধ করা হয়। কিন্তু ভাড়া প্রায়ই অতিরিক্ত প্রদান করে তা বিদেশে পাঠানো হয়।

বৈঠকে এ ধরনের জাহাজ ভাড়া ও পরিশোধের ক্ষেত্রে ফ্লাগ ভ্যাসেল অ্যাক্ট ও অন্য বিধিবিধান অনুসরণ করা হচ্ছে কিনা তা মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এটির দায়িত্ব দেয়া হয় এনবিআরকে।

অর্থ পাচার প্রতিরোধে মোবাইল কোম্পানিগুলোর মুনাফা দেশ থেকে বিদেশে পাঠানোর কার্যক্রম মনিটরিংয়ের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মানি লন্ডারিং সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি। কারণ বর্তমান ১৩ কোটি রেজিস্টার সিম রয়েছে কোম্পানিগুলোর। এ খাত থেকে অর্জিত অর্থের একটি বড় অংশ মোবাইল কোম্পানিগুলো বিভিন্ন পদ্ধতিতে দেশের বাইরে পাঠাচ্ছে। এক্ষেত্রে নিয়ম লংঘন করে অর্থ পাঠানো হচ্ছে কিনা এটি মনিটরিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

জাতীয় সমন্বয় কমিটির বৈঠকে বলা হয়, দেশের ভেতর ভূমি কেনাবেচার সময় প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম দেখিয়ে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হচ্ছে। একই পদ্ধতিতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে আইনের ত্রুটি ও প্রতিবন্ধকতা দূর করতে আইন সংশোধনের প্রস্তাব দেয়া হয়। তবে বৈঠকে জমি রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান পদ্ধতির বিপরীতে ’মার্কেট বেইজ ট্রানজেকশন’ পদ্ধতি অনুসরণ করতে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়কে নিদের্শ দেয়া হয়।

Facebook Comments

" বিশ্ব অর্থনীতি " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ