Foto

মুসলিম বন্দী শিবিরগুলো আইন করে বৈধ করেছে চীন


গত কয়েক দশকে হান চীনারা (চীনের সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিগোষ্ঠী) শিনজিয়াংয়ে গিয়ে বসতি গেড়েছে যেটা উইঘুররা একেবারেই পছন্দ করেনি। বহু উইঘুর মুসলিম নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া আসছিল প্রতিদিন। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল চীনা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। উইঘুর মুসলিম নাগরিক নিখোঁজ হওয়ার পেছনে মানবাধিকার সংগঠনগুলো চীনা সরকারের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করলেও কর্তৃপক্ষ এতদিন তা কানেই তোলেনি। তবে, আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ বাড়ার মধ্য দিয়ে এ বিষয়ে চীনা কর্তৃপক্ষ মুখ খুলেছে। সম্প্রতি দেশটির শিনজিয়াং প্রদেশের কর্তৃপক্ষ বন্দী শিবিরগুলোকে আইন করে বৈধতা দিয়েছে।


চীনা কর্তৃপক্ষ এতদিনে স্বীকার করল তারা বহু উইঘুর মুসলিমকে বন্দী শিবিরে নিয়ে রেখেছে। এর কারণ হিসেবে তারা বলছে, ইসলামী কট্টরবাদ মোকাবেলার অংশ হিসেবে আটক করা উইঘুরদের আদর্শ শেখান, তাদের চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
মানবাধিকারের ওপর সম্প্রতি এক বৈঠকে উপস্থিত চীনা কর্মকর্তারা বলছেন, ধর্মীয় উগ্রবাদের কবলে পড়া উইঘুরদের নতুন করে শিক্ষা এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তবে, কীভাবে তা করা হচ্ছে তা চীনা কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে বলেননি।
অন্যদিকে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, এ সব শিবিরে প্রেসিডেন্ট শি জিন-পিংয়ের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে উইঘুরদের শপথ নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। একইসঙ্গে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে আত্মসমালোচনা করানো হচ্ছে।
শিনজিয়াং এ গত কয়েকবছর ধরে অব্যাহত সহিংসতার দায় বিচ্ছিন্নতাবাদী ইসলামী সন্ত্রাসীদের বলে দাবি করে আসছে চীনা কর্তৃপক্ষ।
এর আগে চীন সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল তারা বিপুল সংখ্যক উইঘুর মুসলিমকে বন্দী শিবিরের ভেতরে আটকে রেখেছে।
এই বছরের আগস্টে জাতিসংঘের একটি কমিটি জানতে পেরেছে যে, ১০ লাখের মতো উইঘুর মুসলিমকে পশ্চিমাঞ্চলীয় শিনজিয়াং অঞ্চলে কয়েকটি শিবিরে বন্দী করে রাখা হয়েছে।
চীনা আইনে কী বলা হয়েছে?
চীন শিনজিয়াংয়ে কী করছে নতুন এই আইনের মাধ্যমে এই প্রথম তার একটি ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
আইনে বলা হয়েছে, যে সব আচরণের কারণে বন্দী শিবিরে আটক করা হতে পারে তার মধ্যে রয়েছে- খাবার ছাড়া অন্য হালাল পণ্য ব্যবহার, রাষ্ট্রীয় টিভি দেখতে অস্বীকার করা, রাষ্ট্রীয় রেডিও শুনতে অস্বীকার করা, রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে বাচ্চাদের দূরে রাখা।
চীন বলছে, এ সব বন্দী শিবিরে চীনা ভাষা শেখান হবে, চীনের আইন শেখান হবে এবং বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
হালাল পণ্যের বিরুদ্ধে প্রচারণা
শিনজিয়াংয়ে বিভিন্ন ইসলামী রীতি ও আচারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রচারণা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে খাদ্য ছাড়া বিভিন্ন হালাল পণ্য ব্যবহারের প্রবণতার বিরোধিতা করা হচ্ছে।
স্থানীয় একটি সংবাদপত্রে লেখা হয়েছে, টুথপেষ্টের মতো পণ্যে হালাল জড়িয়ে মানুষকে ধর্মীয় উগ্রবাদের পথে নেওয়া হচ্ছে।
এর আগে ৮ অক্টোবর, সোমবার প্রাদেশিক কমিউনিস্ট পার্টির এক সভায় নেতারা হালাল পণ্য ব্যবহারে প্রবণতা প্রতিরোধে অঙ্গীকার করেন।
নতুন আইনে পরিষ্কার করে বলা হয়েছে, মুসলিম নারীদের জন্য মুখ ঢাকা বোরকা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের এবং কর্মকর্তাদের স্থানীয় ভাষা ব্যবহারের পরিবর্তে চীনা মান্দারিন ভাষা ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শিবিরগুলো কেমন?
এ সব বন্দী শিবিরে আটকে ছিলেন এমন লোকজন বিবিসির কাছে সেখানে শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতনের কথা বলেছেন।
সাবেক বন্দীদের উদ্ধৃত করে নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, বন্দীদের জোর করে কমিউনিস্ট পার্টির বন্দনা করে গান গাওয়ানো হয়। গানের কথা ভুলে গেলে সকালের নাশতা দেওয়া হয় না।
তবে চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ইংরেজি পত্রিকা গ্লোবাল টাইমস লিখেছে, অতিরিক্ত নিরাপত্তার কারণে এই অঞ্চলটিকে চীনের সিরিয়া বা চীনের লিবিয়া হওয়া থেকে থামানো গেছে।
উইঘুর মুসলিমরা শিনিজিয়াংয়ের জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ। জাতিগত-ভাবে তারা নিজেদেরকে মধ্য এশিয়ান মনে করে। তাদের ভাষা অনেকটা তুর্কি ভাষার মতো।
গত কয়েক দশকে হান চীনারা (চীনের সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিগোষ্ঠী) শিনজিয়াংয়ে গিয়ে বসতি গড়েছে যেটা উইঘুররা একেবারেই পছন্দ করেনি।

Facebook Comments

" বিশ্ব সংবাদ " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ