Foto

সংস্কারপন্থীদের নিয়ে চাপে জামায়াত


একটি নতুন রাজনৈতিক দল বা মঞ্চ তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর সংস্কারপন্থীদের একটি অংশ। সংস্কারপন্থীরা অবশ্য এখনই নতুন দল না বলে ‘রাজনৈতিক উদ্যোগ’ বলছেন। ২৭ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে এই উদ্যোগের প্রকাশ হতে পারে। সম্প্রতি ঢাকায় জামায়াতের বিভিন্ন অঞ্চল এবং পেশার সাবেক ও বর্তমান দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের এক সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়েছে।


সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, সংস্কারপন্থীদের নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ গভীর চাপ ও উদ্বেগে ফেলেছে জামায়াতের মূল নেতৃত্বকে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দলের নীতিনির্ধারকেরা বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটে আর না থাকার যে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেখান থেকে সরে এসেছেন। তারই অংশ হিসেবে জামায়াত ৯ এপ্রিল ২০-দলীয় জোটের সভায় অংশ নেয়। যদিও আগের দিন রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারামুক্তির দাবিতে অনুষ্ঠিত প্রতীকী অনশনে তারা অংশ নেয়নি।

হঠাৎ সিদ্ধান্ত বদলের বিষয়ে জামায়াতের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের মতামত জানা যায়নি। তবে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংস্কারপন্থীদের রাজনৈতিক তৎপরতায় জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। তাঁরা মনে করছেন, এ পরিস্থিতিতে বিএনপির সঙ্গে ছাড়াছাড়িতে গেলে, তাঁদের অবর্তমানে সংস্কারপন্থীদের কোনো বোঝাপড়া হয়ে যায় কি না, সে আশঙ্কায় জ্যেষ্ঠ নেতারা জরুরি বৈঠক করে জোট ছাড়ার সিদ্ধান্ত বদলান। গত সপ্তাহে রাজধানীতে জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের নিয়ে সদ্য বহিষ্কৃত নেতা মজিবুর রহমানের নেতৃত্বে একটি সভার কথা জানাজানি হওয়ার পর জামায়াতের নীতিনির্ধারকেরা নড়েচড়ে বসেন।

মজিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, "আমরা কোনো দল বা মঞ্চ নয়, একটি নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের জন্য কাজ শুরু করেছি। আগামী ২৭ এপ্রিল এর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে। তবে এর দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত নয়।"

জামায়াতের মধ্যম সারির দুজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংস্কারপন্থীদের নতুন দল গঠনের উদ্যোগ ঠেকাতে পাল্টা তৎপরতা শুরু করেছে দলটি। আপাতত তাদের লক্ষ্য, লন্ডনে অবস্থানরত সদ্য পদত্যাগী জামায়াত নেতা আবদুর রাজ্জাক ও সদ্য বহিষ্কৃত নেতা মজিবুর রহমান। এ দুজনের কার্যক্রম ও তৎপরতার ওপর সতর্ক নজর রাখছে জামায়াত। এদিকে আবদুর রাজ্জাকের আইন পেশার ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আজ লন্ডনের ওসবর্নে একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠান হবে। অনুষ্ঠানের আয়োজকেরা রাজ্জাকের শুভাকাঙ্ক্ষী এবং জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কিত।

ঢাকায় ও লন্ডনে জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ের সূত্র জানায়, অনুষ্ঠানে যাতে জামায়াতের নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা অংশ না নেন, সে জন্য ঢাকা থেকে সাংগঠনিকভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জামায়াতের সংস্কারের পক্ষে দেশের বাইরে বড় সমর্থন রয়েছে যুক্তরাজ্যের নেতা-কর্মীদের। আবদুর রাজ্জাক অনেক দিন থেকে সেখানে আছেন। তাই তাঁকে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের ভিত্তি গড়ে ওঠে কি না, সে জন্য জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকে উদ্বিগ্ন। দলের নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল শফিকুর রহমান এ বিষয়ে লন্ডনের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।

"এন ইভিনিং উইথ ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক" শিরোনামে ওই অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করবেন আইনজীবী সাইফ উদ্দিন খালেদ। তিনি গত বুধবার রাতে লন্ডন থেকে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, "যাঁরা রাজ্জাক সাহেবকে পছন্দ করেন না, তাঁদের দু-একজন আমাকে অনুষ্ঠানের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করেছেন। তবে তা যে সংঘবদ্ধভাবে হয়েছে, তা নয়।"

এর আগে গত ২৫ মার্চ ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে নিউজিল্যান্ডের মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় হতাহত ব্যক্তিদের স্মরণে আয়োজিত শোকসভা নিয়েও সাংগঠনিকভাবে কড়াকড়ি অবস্থান নিয়েছিল জামায়াত। শোক সংহতি নামে ওই স্মরণসভায় প্রবীণ আইনজীবী ড. কামাল হোসেনসহ বিশিষ্ট নাগরিকেরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন জামায়াতের সাবেক নেতা মজিবুর রহমান।

দলীয় সূত্র জানায়, ওই অনুষ্ঠানে আলোচক ছিলেন জামায়াত সমর্থক এমন অনেককে ফোন করে যেতে নিষেধ করা হয়। তবে তাঁরা নিষেধ শোনেননি। তাঁদের অনেককে ডেকে কারণ জানতে চাওয়া হয়েছে। জামায়াতের একজন শীর্ষ পর্যায়ের নেতা কাউকে কাউকে ডেকে কথা বলেছেন। এ পরিস্থিতিতে জামায়াতের নীতিনির্ধারকেরা গত সপ্তাহে জরুরি সভা করে সংস্কারপন্থীদের তৎপরতার বিষয়ে সতর্ক করেন। সংস্কারপন্থীদের কার্যক্রমের ওপর নজর রাখতে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের তিন নেতা নুরুল ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ও কামাল উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি দল, ঢাকা মহানগর উত্তরের তিন নেতা সেলিম উদ্দিন, রেজাউল করিম ও আবদুর রহমানের আরেকটি দলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে তাঁরা সংস্কারমনস্ক জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতাদের অনেককে ডেকে আলাদা কথা বলেছেন।

মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং দলের সংস্কার নিয়ে সম্প্রতি জামায়াতে বিরোধ দেখা দেয়। যার রেশ ধরে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি জামায়াত থেকে পদত্যাগ করেন প্রভাবশালী নেতা আবদুর রাজ্জাক। তিনি দলের জ্যেষ্ঠ সহকারী সেক্রেটারি ছিলেন। এ বিষয়ে প্রকাশ্য অবস্থান নেওয়ায় দল থেকে বহিষ্কার হন মজিবুর রহমান।

সংস্কারপন্থীদের দাবি ও চাপে পড়ে জামায়াত দলের মাঠপর্যায়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাছে জরুরি দৃষ্টি আকর্ষণী নোটিশ পাঠিয়ে নতুন সংগঠন গড়ার ঘোষণা দেয়। যদিও গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়ে জামায়াত দাবি করেছে, তাদের দলে সংস্কারপন্থী বলে কিছু নেই।

দলের সংস্কারপন্থীদের নতুন দল গঠনের উদ্যোগ এবং ঢাকায় ও লন্ডনের দুটি সভার ব্যাপারে দলের নজরদারির বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য আবদুল হালিম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এসব বিষয়ে কথা না বলার ব্যাপারে দলের সিদ্ধান্ত আছে।

 

Facebook Comments

" রাজনীতি " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ