Foto

সিন্ডিকেট গিলে খাচ্ছে বিমান


বিমানে অনিয়ম-দুর্নীতির নেপথ্যে রয়েছে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, রাজনৈতিক পদবিধারী প্রভাবশালী ঠিকাদার ও ট্রেড ইউনিয়নের কর্তাব্যক্তিদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সদর দপ্তরসহ বিভিন্ন পর্যায়ের অফিসে সব সময় তৎপর এই সিন্ডিকেটই গিলে খাচ্ছে রাষ্ট্রীয় এ প্রতিষ্ঠানকে। অনেক চেষ্টা করেও সিন্ডিকেটে ফাটল ধরানো যাচ্ছে না।


দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দুটি প্রাতিষ্ঠানিক টিম বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও বেবিচকের অনিয়ম, দুর্নীতি অনুসন্ধান করতে গিয়ে এই সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব পেয়েছে। যার সঙ্গে যোগসাজশ রয়েছে প্রতিষ্ঠান দুটির বিভিন্ন শাখা ও বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের। দুদক বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে আটটি ও বেবিচকে ১১টিসহ মোট ১৯টি দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করেছে।

তবে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মহিবুল হক সমকালকে বলেন, দুদকের প্রতিবেদন দুটিতে সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির তথ্য নেই। দুদক বিভিন্ন উৎসের উল্লেখ করে জানিয়েছে, ওইসব ক্ষেত্রে দুর্নীতি হয়েছে। এগুলো এক ধরনের ঢালাও অভিযোগ। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে ভালো হতো। তবে প্রতিবেদনে যেসব দুর্নীতির কথা বলা হয়েছে মন্ত্রণালয় থেকে সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হবে।

দুদক পরিচালক ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুসন্ধান টিম দুটির নেতা সৈয়দ ইকবাল হোসেন সমকালকে বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে বিমানের ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে সৎ ও দক্ষ বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের কর্মকর্তার ভূমিকা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। সেবার মান উন্নয়নে দুর্নীতি দূর করতে কর্তৃপক্ষকে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম হাতে নিতে হবে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের তিন সদস্যের অনুসন্ধান টিমের অন্য দুই সদস্য হলেন অবসরপ্রাপ্ত উপপরিচালক শেখ আবদুস ছালাম ও সহকারী পরিচালক মো. সালাহ উদ্দিন। বেবিচকের অনুসন্ধান টিমের অন্য দুই সদস্য হলেন উপপরিচালক মো. সামছুল আলম ও সহকারী পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান।

দুদকের দুটি প্রাতিষ্ঠানিক টিম এই প্রতিষ্ঠান দুটিতে দীর্ঘ অনুসন্ধান চালিয়ে লাগামহীন অনিয়ম-দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রতারণা-জালিয়াতির তথ্য-প্রমাণ নিয়ে আলাদা দুটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। রোববার দুদক কমিশনার ড. মো. মোজাম্মেল হক খান সচিবালয়ে গিয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলীর কাছে প্রতিবেদন দুটি জমা দিয়েছেন।

এদিকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সূত্র জানাচ্ছে, দুদক দুর্নীতির যেসব উৎসের উল্লেখ করেছে, সেগুলোর সমস্যা সমাধান চলমান প্রক্রিয়ার অংশ। দুদক সুনির্দিষ্ট করে দুর্নীতির তথ্য উল্লেখ করলে ভালো হতো। যেমন, বিমানের টিকিট নিয়ে সমস্যা রয়েছে। এর সমাধান করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, ফ্লাইট খালি যাচ্ছে, অথচ টিকিট কিনতে চাইলে জানানো হচ্ছে টিকিট নেই। এটি একটি সমস্যা। এ সমস্যার সমাধান চলমান রয়েছে।

তবে দুদক সূত্র জানাচ্ছে, প্রতিবেদনে উল্লেখ করা না হলেও দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক টিম দুটির অনুসন্ধানে অনিয়ম, দুর্নীতির নানা তথ্যও পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে যুক্ত এই সূত্র জানায়, যারা বিমান বাংলাদেশ এয়ার লাইন্স ও বেবিচকের দেখভাল করেন, দুর্নীতি-অনিয়মের প্রক্রিয়ায় তাদেরও অংশগ্রহণ রয়েছে। তাদের দুর্বলতার সুযোগেই টেন্ডার, কেনাকাটা, লিজ, মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ, নির্মাণ, উন্নয়নমূলক কাজসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারি অর্থ লুটপাট করার এ সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে।

সূত্র জানায়, বিমান অত্যাধুনিক কারিগরি সংস্থা হওয়ায় এখানে সূক্ষ্ণ কারচুপিসহ নানা দুর্নীতি চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ সংকট থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বিশেষভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন পর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে বিমানসংশ্নিষ্ট বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ দিতে হবে। প্রতিষ্ঠান দুটিতে মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং জোরদার করতে হবে।

বিমানে দুর্নীতির আট উৎস : এই আট উৎসের মধ্যে রয়েছে বিমান ক্রয় ও লিজ, রক্ষণাবেক্ষণ ও ওভারহোলিং, গ্রাউন্ড সার্ভিস, কার্গো আমদানি-রফতানি, যাত্রী, অতিরিক্ত ব্যাগেজের চার্জ আত্মসাৎ, টিকিট বিক্রি ও ফুড ক্যাটারিং কাজে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি।

বিমানের দুর্নীতি বন্ধে আট সুপারিশ : এসব সুপারিশের মধ্যে রয়েছে- দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করে যে কোনো ব্যয়বহুল ক্রয়ের যথার্থতা, স্পেসিফিকেশন ও প্রাক্কলনসহ দরপত্র যাচাই-বাছাই করা, বিমান লিজের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে লিজ চুক্তির শর্ত নির্ধারণ করা, বিমানের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জাম ক্রয়ের তালিকা তৈরি, কখন কেনা হয়েছে, কী দামে কেনা হয়েছে, কোন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কেনা হয়েছে, কত টাকা পরিশোধ করা হয়েছে- এসব রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করা, রক্ষণাবেক্ষণ ও ওভারহোলিং খাতে কেনাকাটার সময় আন্তর্জাতিক দরপত্রের নিয়ম সঠিকভাবে মানা হচ্ছে কি-না তা পর্যালোচনার জন্য বিষেশজ্ঞ টিম গঠন করা, বিমানে দক্ষ গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার গড়ে তোলার জন্য আন্তর্জাতিক স্ব্বনামধন্য গ্রাউন্ড হ্যান্ডলারের সঙ্গে ৩-৫ বছর মেয়াদে চুক্তি করা ইত্যাদি।

এ ছাড়া রয়েছে বিমানের কার্গো ওজনের কাজটি নিয়মিত মনিটর করা; বিমানের ট্রানজিট/লে-ওভার প্যাসেঞ্জারের হিসাব ম্যানুয়ালি সংরক্ষণের বদলে মানসম্মত সফটওয়ারের মাধ্যমে ডিজিটালাইজ করা; অতিরিক্ত ব্যাগেজের চার্জ আত্মসাৎ রোধে মনিটরিং জোরদার করা; বিমানের ওয়েবসাইট সার্বক্ষণিক আপটেড রাখাসহ বিভিন্ন সুপারিশ।

বেবিচকে দুর্নীতির ১১ উৎস : দুর্নীতির এসব উৎসের মধ্যে রয়েছে- কেনাকাটা, নির্মাণ ও উন্নয়নমূলক কাজ, সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা, বিমানবন্দরের স্পেস, স্টল ও বিলবোর্ড ভাড়া, পরামর্শক নিয়োগ, কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণ, মনট্রিল কনভেনশন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ, পাইলট, ফাইং ইঞ্জিনিয়ার ও এয়ারক্র্যাফটের লাইসেন্স, ফাইট ফ্রিকোয়েন্সি ও সিডিউল অনুমোদন ও বিভিন্ন অপারেশনাল কাজ।

বেবিচকের দুর্নীতি বন্ধে ১১ সুপারিশ : বেবিচকে চিহ্নিত ১১ দুর্নীতি বন্ধে সুপারিশ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- বেবিচকে দুর্নীতি বন্ধে বুয়েটের শিক্ষকসহ অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ক্রয় কমিটি গঠন করে ক্রয়ের মান ও মূল্যের যথার্থতা নির্ণয়ের ব্যবস্থা করা, কেনাকাটায় অতীতের দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে বিশেষজ্ঞ কমিটি করা, নির্মাণকাজ মূল্যায়নের জন্য বুয়েটের শিক্ষকসহ বিভিন্ন সংস্থার অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে নিরপেক্ষ মেয়াদি কমিটি করা, নিয়মতান্ত্রিকভাবে সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার জন্য বেবিচকের সম্পত্তি অধিশাখায় পরিচালক বা সমপর্যায়ের কর্মকর্তার পদায়ন করা এবং সম্পত্তি পুনরুদ্ধার ও অবৈধ দখলদারমুক্ত করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নেওয়া ইত্যাদি।

এ ছাড়াও রয়েছে উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে উপযুক্ত দেশি/বিদেশি অভিজ্ঞ কনসালট্যান্ট নিয়োগ, এ পর্যন্ত নিয়োগকৃত উপদেষ্টাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখা, জনস্বার্থ-সংশ্নিষ্ট মনট্রিল কনভেনশন এখনও র‌্যাটিফাই না করার কারণ খতিয়ে দেখা ইত্যাদি সুপারিশ।

দুদক পরামর্শ দিয়েছে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ, মেরামত ও সংস্কার কাজ ও সব কেনাকাটার ক্ষেত্রে ই-টেন্ডারিং ব্যবস্থা চালু করা, ফাইট ইঞ্জিনিয়ার ও এয়ার লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে দুর্নীতির এলাকাগুলো চিহ্নিত করা এবং ফাইট ফ্রিকোয়েন্সি ও সিডিউল অনুমোদনের আবশ্যিকভাবে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার তথা বাংলাদেশ বিমানের অনাপত্তিপত্র নেওয়ার। এ ছাড়া দক্ষ কর্মকর্তাদের যথাযথ জায়গায় পদায়ন এবং বিমানবন্দরে অপারেশনাল কাজের জন্য অফিসারের পাশাপাশি প্রশাসনিক কাজে দক্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সমন্বয়ক নিয়োগের সুপারিশও করেছে দুদক।

Facebook Comments

" জাতীয় খবর " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ